• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২৮ এএম


১৮ জুলাই: রক্ত, আগুন আর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটে থমকে গিয়েছিল বাংলাদেশ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৮ জুলাই ২০২৬ ৯:৪৩ এএম

২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম আলোচিত ও রক্তাক্ত দিন ছিল ১৮ জুলাই। আজ ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই, সেই ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো। দুই বছর আগে এই দিনে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের অন্তত ৪৭টি জেলায় সংঘর্ষ, প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ এবং নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ঘটনায় কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল গোটা বাংলাদেশ।‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ১৮ জুলাই সকাল থেকেই ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অবস্থান নেন আন্দোলনকারীরা। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়।সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় উত্তরার আজমপুর এলাকায়।

পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষে কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল এবং উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চত্বরও সংঘাতের প্রভাব থেকে রক্ষা পায়নি। ওই দিন শুধু উত্তরাতেই অন্তত আটজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়।একই দিনে মানবিকতার এক প্রতীক হয়ে ওঠেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-এর শিক্ষার্থী মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধ। উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি আন্দোলনকারীদের মধ্যে পানি ও বিস্কুট বিতরণ করছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, “পানি লাগবে, পানি?”—এই আহ্বান জানানোর সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি নিহত হন। পরবর্তীতে তার মৃত্যু আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।এদিন রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। ধানমন্ডিতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের শিক্ষার্থী ফারহান ফাইয়াজ।

যাত্রাবাড়ীতে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন সাংবাদিক মেহেদি হাসান। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই একদিনেই অন্তত ২৭ থেকে ৩১ জন প্রাণ হারান।দুপুরের পর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। মহাখালীতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর এবং বনানীর সেতু ভবনে ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হয়। মিরপুর-১০ নম্বরে পুলিশ বক্সে আগুন লাগার পর ধোঁয়া মেট্রোরেল লাইনে ছড়িয়ে পড়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে মেট্রোরেলের চারটি স্টেশন সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।বিকেলে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) প্রধান কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এর ফলে রাষ্ট্রীয় এই টেলিভিশন চ্যানেলের সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।তবে ১৮ জুলাইয়ের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল দেশব্যাপী ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। আগের রাত থেকেই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও, ১৮ জুলাই রাত ৯টার পর সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটও সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

পরবর্তীতে টানা পাঁচ দিন ব্রডব্যান্ড এবং আট দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ থাকার ঘটনা বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট’ হিসেবে পরিচিতি পায়।শুরুতে মহাখালীর খাজা টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডকে ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, পরে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (আইএসপিএবি) জানায়, সরকারি নির্দেশেই মূলত ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছিল।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে তৎকালীন তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়।পরিস্থিতির অবনতির মধ্যে তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান এবং কোটা সংস্কারের আশ্বাস দেন।

তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “গুলি আর আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।”দুই বছর পরও ১৮ জুলাইয়ের সেই রক্তক্ষয়ী দিন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচিত। সংঘাত, প্রাণহানি, অগ্নিসংযোগ এবং নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের ঘটনাগুলো আজও মানুষের স্মৃতিতে অমলিন হয়ে আছে।

/বিএসএস