• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৫:২৭ এএম


‘‘আজ তিন দিন ধইরা গো সোনা, ভাত কী জিনিস দেখতাছি না। ছেঁড়া কাপড় পইড়া আছি।”

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৪ জুলাই ২০২৬ ৮:৫৫ পিএম

‘আজ তিন দিন ধইরা গো সোনা, ভাত কী জিনিস দেখতাছি না। ছেঁড়া কাপড় পইড়া আছি। একটা কাপড় ভিজে, আবার শুকাইলে ওইটাই পরি; বদলানোর মতো অন্য কোনো কাপড় নাই। ঘরদোর ভাইঙা পানিতে লইয়া গেছেগা। খাওয়ার মতো কিছু নাই। পোলাপান লইয়া একেবারে অসহায় হইয়া পড়ছি।’

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ গ্রামের বৃদ্ধা মরিয়ম বিবি। খোয়াই নদীর ভয়াবহ বন্যায় ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল হারিয়ে এখন খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন কাটছে তার পরিবারের।

মরিয়ম বিবি বলেন, তার স্বামী হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। বন্যার পর তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, খাবারেরও তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তিনি সমাজের বিত্তবান ও সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

একই ইউনিয়নের চরহামুয়া গ্রামের রোকেয়া বেগমের অবস্থাও একই রকম। বন্যার পানি কিছুটা নেমে গেলেও ঘরের ভেতরে এখনো হাঁটুসমান কাদা জমে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘একবারে নির্মম অবস্থা। আমার ঘরে কোমর পর্যন্ত পানি উঠেছিল। ঘরের সব জিনিস নষ্ট হয়ে গেছে। নতুন করে এসব কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।’

নোয়াবাদ গ্রামের কৃষক মনু মিয়ার কয়েক মাসের পরিশ্রমও এক রাতেই পানিতে ভেসে গেছে। চারটি মাছের ঘের, আউশ ধানের ক্ষেত এবং ঘরে মজুত সাত-আট মণ ধান হারানোর পাশাপাশি তার বসতঘরও ধসে পড়েছে। ঘর চাপা পড়ে আহত হয়েছে তার একমাত্র ছেলে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনু মিয়া বলেন, ‘জীবনে যা কামাইছিলাম, এক রাতেই সব শেষ। আমি এখন একেবারে নিঃস্ব।’

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং টানা ভারী বর্ষণে ফুলে-ফেঁপে ওঠা খোয়াই নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ সদর উপজেলার লস্করপুর ইউনিয়নের কালিগঞ্জ এলাকায় ভেঙে যায়। মুহূর্তেই প্রবল স্রোতের পানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। রাতের অন্ধকারে জীবন বাঁচাতে শিশু, বৃদ্ধ ও গবাদিপশু নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটতে বাধ্য হন হাজারো মানুষ।

বাঁধ ভাঙার ঘটনায় সদর উপজেলার লস্করপুর ও পইল ইউনিয়ন এবং বাহুবল উপজেলার লামাতাসি ইউনিয়নের অন্তত ৩৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। ডুবে যায় অসংখ্য বসতবাড়ি, ফসলি জমি, সবজির ক্ষেত, ফলের বাগান, মাছের ঘের, পোল্ট্রি খামার ও গ্রামীণ সড়ক। হবিগঞ্জ-মিরপুর আঞ্চলিক সড়কের বিভিন্ন অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় ৬৯৭ হেক্টর আউশ ধান, ১৩১ হেক্টর শাকসবজি এবং ২০ হেক্টর ফলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া কয়েকশ পুকুর ও মাছের ঘেরের মাছ ভেসে যাওয়ায় মৎস্যচাষিদের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। হাঁস-মুরগি, পোল্ট্রি খামার ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানও ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েছে। শুধু সদর উপজেলাতেই প্রায় ৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জেলা প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র চালু করে ত্রাণ বিতরণ শুরু করেছে। জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার তথ্যমতে, তিন উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৬ হাজার ৪৪৫টি পরিবার পানিবন্দি হয়েছে এবং প্রায় ২৮ হাজার ১৪০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নগদ অর্থ, ১০০ মেট্রিক টন চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হলেও প্রত্যন্ত এলাকার অনেক পরিবার এখনো পর্যাপ্ত সহায়তা পাননি।

এদিকে খোয়াই নদীর পানি কমতে শুরু করলেও কুশিয়ারা, কালনী-কুশিয়ারা ও সুতাং নদীর পানি এখনো কয়েকটি স্থানে বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে। ফলে বানিয়াচং, নবীগঞ্জ, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাইয়ের হাওরাঞ্চলে নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খোয়াই নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশ ও তীরের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এতে প্রতিরক্ষা বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ভাঙনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। চরহামুয়া গ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে।

রোববার (১২ জুলাই) ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আলহাজ্ব জি কে গউছ বলেন, খোয়াই নদী থেকে বালু উত্তোলনের কোনো বৈধ ইজারা নেই। আইন অমান্য করে যারা এ কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোয়াইয়ের পানি ধীরে ধীরে নামলেও বন্যার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে মানুষের জীবনে। মরিয়ম বিবির খালি হাঁড়ি, রোকেয়া বেগমের কাদায় ভরা ঘর আর মনু মিয়ার খালি মাছের ঘের যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে—একটি বাঁধ ভাঙা শুধু মাটি নয়, মানুষের বহু বছরের স্বপ্ন ও জীবিকার ভিত্তিও ভেঙে দেয়।

/এএসএফ