ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলায় আকবর মণ্ডল (৪৭) নামে এক দরিদ্র মুসলিম ফেরিওয়ালাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে ওই অঞ্চলে মুসলিমদের বিরুদ্ধে ভীতিকর ও বিদ্বেষমূলক পরিবেশ তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, দাড়ি থাকার কারণে মুসলিম ফেরিওয়ালাদের অনেক সময় জোরপূর্বক ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিতেও বাধ্য করা হতো।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৯ জুন আকবর মণ্ডল নিহত হন। তার ২০ বছর বয়সী ছেলে জুলফিকার দাবি করেছেন, এলাকায় বিরাজমান ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশই তার বাবার মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
দারিদ্র্যের কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়া জুলফিকার বর্তমানে বাবার মতোই পুরুলিয়ার বান্দোয়ান এলাকায় ফেরিওয়ালার কাজ করেন। তিনি জানান, ৯ জুন সকালে আকবর মণ্ডল ভ্যানে করে স্টিলের বাসনপত্র বিক্রি করছিলেন। এ সময় সুপুরডিহি গ্রামে তাকে জোর করে টেনে একটি বাড়ির ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক অপরিচিত ব্যক্তি তার ওপর হামলা চালায়।
জুলফিকারের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারী প্রথমে তার বাবাকে লাঠি দিয়ে মারধর করে। আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে পরে তাকে কুড়াল দিয়ে আঘাত করা হয়।
তিনি বলেন, ‘দুপুরের দিকে বান্দোয়ান থানা থেকে একজন পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে জানান, আমার বাবা খুন হয়েছেন। দ্রুত বান্দোয়ান হাসপাতালে যেতে বলেন।’
হাসপাতালে গিয়ে বাবার মরদেহ দেখতে পান বলে জানান জুলফিকার। তিনি বলেন, ‘তার মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়েছিল। দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। পুরো শরীর রক্তে ভেজা ছিল। চিকিৎসকেরা আমাকে জানান, হাসপাতালে আনার অনেক আগেই তিনি মারা গেছেন।’
এ সময় তিনি অভিযোগ করেন, শুধুমাত্র দাড়ি থাকার কারণে কিছু মানুষ তাদের ‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বাধ্য করত। তারা বলত, ওই এলাকায় আর মুসলিম ফেরিওয়ালাদের ব্যবসা করতে দেওয়া হবে না। জুলফিকারের দাবি, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সেখানে ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি হয়েছে এবং তারা সবসময় আতঙ্কের মধ্যেই কাজ করেন।
তিনি তার বাবার হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
পুনিশোল গ্রামের মণ্ডলপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা খেলাফত হোসেন মণ্ডলও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, প্রায় ১৪ বছর ধরে তাদের গ্রামের মানুষ ওই এলাকায় কোনো সমস্যা ছাড়াই ফেরি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। তবে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর মুসলিমদের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, পুনিশোলের অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র ও শ্রমজীবী হওয়ায় তারা প্রতিদিন দুশ্চিন্তা নিয়েই কাজে বের হন।
এদিকে ঘটনার বিষয়ে ১০ জুন পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি জানান, অভিযুক্ত বিশ্বনাথ মাহাতোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বাড়ির ভেতরেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়েছে বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।
তিনি বলেন, হত্যার পেছনের কারণ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। কোনো ঝগড়া বা বিরোধের জেরেও এ ঘটনা ঘটতে পারে। পাশাপাশি এখন পর্যন্ত তদন্তে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
/এসএন