যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যর্থ চেষ্টার ছয় দিন পর জ্ঞান ফিরেছে দণ্ডিত আসামি ক্রিস্টা পাইকের। তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তিনি এখন জীবিত আছেন এবং কথা বলছেন। খবর বিবিসির।
৫০ বছর বয়সী ক্রিস্টা পাইক বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তার আইনজীবীদের ভাষ্য, হাসপাতালে তাকে হাতকড়া পরিয়ে রাখা হয়েছে এবং তিনি জরুরি চিকিৎসা নিচ্ছেন।
১৯৯৫ সালে ১৯ বছর বয়সী কলিন স্লেমারকে হত্যার দায়ে পাইককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। গত বুধবার টেনেসিতে প্রাণঘাতী ইনজেকশনের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করা হয়। তবে দুই দফা ইনজেকশন দেওয়ার পরও তার মৃত্যু হয়নি।
এরপর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা ইনজেকশনের মাধ্যমে তার শরীরে দেওয়া রাসায়নিক অপসারণের চেষ্টা করেন। কয়েক দিন অচেতন থাকার পর এখন তার জ্ঞান ফিরেছে এবং তিনি কথা বলতে পারছেন।
পাইকের আইনজীবীরা তার জ্ঞান ফিরে আসার ঘটনাকে ‘চিকিৎসাগতভাবে অভূতপূর্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবেন কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সুস্থ হতে তার দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।
ফোর্ডহ্যাম ল স্কুলের অধ্যাপক ও অপরাধবিজ্ঞানী ডেবোরা ডেনো বিবিসিকে বলেন, পাইকের জ্ঞান ফিরে পাওয়া এবং কথা বলতে পারায় তিনি ‘একেবারে হতবাক’ হয়েছেন।
ডেনোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে আরও সাতটি ঘটনা রয়েছে, যেখানে বন্দিরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্ধারিত প্রক্রিয়া থেকে বেঁচে গেছেন। তবে সেসব ঘটনায় বন্দিদের শরীরে প্রাণঘাতী কোনো ওষুধ সফলভাবে প্রবেশ করানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, পাইকই একমাত্র ব্যক্তি, যাকে প্রাণঘাতী কোনো রাসায়নিক ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়ার পরও বেঁচে থাকতে দেখা গেছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়ায় যা যা করার কথা ছিল, সেগুলো করা হয়েছিল; কিন্তু তা কার্যকর হয়নি।
পাইককে পেন্টোবার্বিটাল নামের একটি রাসায়নিকের দুই ডোজ দেওয়া হয়েছিল। তবে কেন সেটি প্রাণঘাতী প্রভাব তৈরি করেনি, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। তাকে আবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার চেষ্টা করা হবে কি না, সেটিও জানানো হয়নি।
এই ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি চলতি বছরের বাকি সময়ের জন্য সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। একই সঙ্গে রাজ্যের কারা বিভাগের প্রধান পদত্যাগের পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন।
পাইকের চিকিৎসক দলের উপদেষ্টা অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট ড. জোয়েল জিভোট বলেন, প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার পর পাইকের বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম ছিল। তার মতে, সাধারণত এ ধরনের ইনজেকশন দেওয়ার পর বন্দিরা মারা যান।
জিভোট জানান, এখনো অনেক বিষয় অনিশ্চিত। পাইকের শরীরে ঠিক কতটা পেন্টোবার্বিটাল প্রবেশ করেছিল, ইনজেকশন দেওয়ার পর তার রক্তে রাসায়নিকটির মাত্রা কত ছিল এবং দীর্ঘমেয়াদে তার শারীরিক অবস্থা কী দাঁড়াবে—এসব এখনো পরিষ্কার নয়।
তার ধারণা, পেন্টোবার্বিটাল সম্ভবত পাইকের রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করে ত্বকের নিচের টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ইনজেকশন দেওয়ার পর তাকে চিকিৎসা দিতে কিছুটা দেরি হওয়ায় তার মস্তিষ্কে ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
পাইকের আইনজীবীরা এর আগে সতর্ক করেছিলেন, তার শারীরিক গঠন, সরু শিরা এবং থ্রম্বোসাইটোসিসের কারণে প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার সময় তিনি অপ্রয়োজনীয় ব্যথা ও যন্ত্রণার শিকার হতে পারেন। মঙ্গলবার তারা জানান, তার দুই বাহু গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কার্যকর হওয়া এক-তৃতীয়াংশের বেশি মৃত্যুদণ্ড ত্রুটিপূর্ণ বা গুরুতর সমস্যাযুক্ত ছিল। প্রাণঘাতী ইনজেকশনের ক্ষেত্রে সাধারণত শিরায় নির্ভরযোগ্যভাবে ইনজেকশন দেওয়ার পথ তৈরি করতে না পারার কারণে এ ধরনের সমস্যা দেখা দেয়।
টেনেসিতেই চলতি বছরের শুরুতে একই ধরনের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। ১৯৯৪ সালে তিনজনকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া মে মাসে স্থগিত করা হয়। প্রাণঘাতী ইনজেকশন দেওয়ার জন্য তার শিরা খুঁজে পেতে কর্মকর্তারা ব্যর্থ হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। পরে টেনেসির গভর্নর তার মৃত্যুদণ্ড এক বছরের জন্য স্থগিত করেন।
পাইক ১৮ বছর বয়সে তার তৎকালীন প্রেমিক ট্যাডারিল শিপের সঙ্গে কলিন স্লেমারকে হত্যা করেন। সমস্যাগ্রস্ত কিশোর-কিশোরীদের জন্য পরিচালিত একটি কর্ম প্রশিক্ষণ শিবিরে তাদের পরিচয় হয়েছিল।
পাইকের আইনজীবীদের বুধবার ন্যাশভিলের আদালতে হাজির হওয়ার কথা রয়েছে। এরপর তারা আদালতের বাইরে সংবাদ সম্মেলন করার পরিকল্পনা করেছেন।
/এসএন