কম সুদে ঋণ ও আধুনিক প্রযুক্তির সুবিধা নিয়ে ভারতের প্রথম বুলেট ট্রেন প্রকল্প বাস্তবায়নে জাপানের ওপর নির্ভর করেছিল দেশটি। তবে দীর্ঘসূত্রতা, সরঞ্জাম কেনাকাটা এবং নীতিগত মতপার্থক্যের কারণে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রকল্পটি আটকে আছে। দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য রূপ নেওয়ায় মুম্বাই-আহমেদাবাদ উচ্চগতির রেলপথের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
মহারাষ্ট্রের মুম্বাই থেকে গুজরাটের আহমেদাবাদ পর্যন্ত ৫০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ ভারতের রেল নেটওয়ার্ক আধুনিকায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ২০১৫ সালে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ভারত ও জাপান ৯৮০ বিলিয়ন রুপির চুক্তিতে সম্মত হয়েছিল, যা সে সময়ের হিসাবে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। প্রকল্পে জাপান ৫০ বছরের মেয়াদে মাত্র দশমিক ১ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করে।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালে চালুর প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও নির্ধারিত সময়ে তা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে জমি অধিগ্রহণের জটিলতার কারণে নির্মাণকাজ বিভিন্ন সময়ে বাধাগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এরই মধ্যে প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় বেড়ে অন্তত ১ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ১৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
সাম্প্রতিক কয়েক মাসে প্রকল্পটি নিয়ে ভারত ও জাপানের মধ্যে উত্তেজনাও বেড়েছে। জাপানের সাবেক বিচারমন্ত্রী হিদেকি মাকিহারা জুলাই মাসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে প্রকল্পের অগ্রগতি না হওয়ার জন্য পুরো দায় ভারতীয় পক্ষের ওপর চাপান। তিনি মন্তব্য করেন, ‘তারা কখনোই নিজেদের প্রতিশ্রুতি রাখে না।’
জাপানি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে ভারত সিগন্যালিং ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি চুক্তি জার্মান কোম্পানি সিমেন্সকে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সিমেন্স জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী। জেআর ইস্টের নেতৃত্বে থাকা জাপানি কোম্পানিগুলো এ ঘটনায় হতাশ হয়েছে বলে জানা গেছে।
জাপানের অবস্থান হলো, বুলেট ট্রেনের নির্ভরযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও সময়ানুবর্তিতা নিশ্চিত করতে পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমান পরিকল্পনায় জাপানি রেললাইন, ইউরোপীয় সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং ভারতীয় ট্রেনকে একসঙ্গে যুক্ত করে একটি হাইব্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এমন ব্যবস্থা এর আগে কোথাও পরীক্ষা করা হয়নি।
প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক জাপানি সূত্রের ভাষ্য, পরিস্থিতি এখন এতটাই বিশৃঙ্খল হয়ে পড়েছে যে দুই পক্ষের আলোচনা কার্যত অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। তবে জেআর ইস্ট এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
এদিকে উদ্বেগের আরেকটি ইঙ্গিত পাওয়া গেছে টোকিওর পদক্ষেপে। প্রকল্পটি তদারকির জন্য জাপান দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নতুন একটি পদ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে ভারতও ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা নিজেদের উচ্চগতির ট্রেন তৈরি করতে চায়, যার সক্ষমতা জাপানের প্রত্যাশিত ট্রেনের সমতুল্য হবে।
রেল মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, দুই পক্ষই এখন একই অবস্থানে রয়েছে। বিস্তারিত আলোচনা এবং উভয় পক্ষের সম্মতির পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নরেন্দ্র মোদি সরকারের কাছে রেলব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ব্রিটিশ আমলে তৈরি পুরোনো রেল নেটওয়ার্ককে আধুনিক করার পাশাপাশি এটি ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগেরও অংশ। এরই মধ্যে ভারত তাদের ব্রড-গেজ রেলপথের ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ বিদ্যুতায়িত করেছে, যা অনেক ইউরোপীয় দেশের চেয়েও বেশি। মুম্বাই-আহমেদাবাদ রুটেও ইতোমধ্যে ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি সেমি-হাই-স্পিড বন্দে ভারত ট্রেন চলাচল করছে।
রেল মন্ত্রণালয় আরও সাতটি উচ্চগতির রেল করিডর নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। এসব করিডরের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় চার হাজার কিলোমিটার। এই খাতে ১৬ ট্রিলিয়ন রুপি বা প্রায় ১৬৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।
সরকার জানিয়েছে, আগামী গ্রীষ্মে প্রথম ধাপে অন্তত ১০০ কিলোমিটার পথে ভারতীয় তৈরি ধীরগতির ট্রেন চালু করা হবে। তবে জাপানি কূটনীতিকরা বলছেন, প্রথম ধাপের দৈর্ঘ্য হবে মাত্র ৫০ কিলোমিটার। একই সঙ্গে এই সময়সূচি নিয়েও তাদের সন্দেহ রয়েছে।
প্রযুক্তি ও ব্যয়ের বিষয়েও ভারত ও জাপানের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় আলোচকেরা স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, খরচ কমানো এবং ভবিষ্যতে নিজেদের মতো করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রাখার বিষয়কে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিপরীতে জাপান পুরো ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত প্যাকেজ হিসেবে ধরে রাখার পক্ষে।
ভারতীয় পক্ষের ধারণা, জাপানিদের আচরণে এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্বের মানসিকতা প্রকাশ পেয়েছে, যা তাদের বিরক্ত করেছে। জাপানি কূটনীতিকরাও স্বীকার করেছেন, দেশটির করপোরেট খাতে বাইরের বিশ্বের প্রতি এক ধরনের অন্তর্মুখী মানসিকতা রয়েছে, যা দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ জাপানি কূটনীতিক বলেন, জাপানিরা বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং সেগুলো ভালোভাবে বাস্তবায়ন করে। অন্যদিকে ভারতীয়রা লক্ষ্য অনেক উঁচুতে নির্ধারণ করে। সবকিছু পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে না পারলেও তারা বেশ ভালোভাবেই তা সম্পন্ন করে।
রেল মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, প্রকল্পের প্রথম অংশের নির্মাণকাজ ২০২৭ সালের শুরুতে শেষ হতে পারে। কিন্তু জাপানের পরবর্তী প্রজন্মের ই১০ ট্রেন সরবরাহের সম্ভাব্য সময় ২০৩০-এর দশকের শুরু। ফলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার সময় এবং ট্রেন সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এই ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৩২০ কিলোমিটার গতিতে চলতে সক্ষম হবে।
তবে উচ্চগতির রেল প্রকল্প নিয়ে ভারত ও জাপানের বিরোধ যতই গভীর হোক, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার গুরুত্ব অনেক বেশি।
জুলাই মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে ‘ভাই-বোনের মতো’ আরও ঘনিষ্ঠ করা উচিত। ওই বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, আগামী বছর ভারত সীমিত পরিসরে উচ্চগতির রেল চালুর যে লক্ষ্য নিয়েছে, তা জাপান পুরোপুরি বুঝতে পারছে।
ভারতের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, উচ্চগতির রেল প্রকল্পের অগ্রগতির চেয়ে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গতি এখন অনেক বেশি।
/এসএন