• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৪৭ পিএম


‘বন্দে মাতরম’ না গাইলে শাস্তি নয়, পর্যবেক্ষণ ভারতের সুপ্রিম কোর্টের

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮:৫০ পিএম

ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকের স্বাধীনতার কারণে কেউ ‘বন্দে মাতরম’ গান গাইতে অস্বীকার করলে তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয় বলে মৌখিক পর্যবেক্ষণ করেছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জবাব চেয়েছেন দেশটির শীর্ষ আদালত। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত রায় দেওয়া হয়নি।

মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহানার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ কর্ণাটকের সংগীতশিল্পী টি এম কৃষ্ণের দায়ের করা একটি রিট আবেদনের শুনানি করেন। আবেদনে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।

শুনানিতে আদালত ইঙ্গিত দেন, কোনো ব্যক্তি ধর্মীয় বিশ্বাস বা বিবেকগত আপত্তির কারণে জাতীয় সংগীত বা জাতীয় গান গাইতে না চাইলে শুধু সেই কারণে তাঁকে ফৌজদারি শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া যায় কি না, বিষয়টি সাংবিধানিক অধিকারের আলোকে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। আদালত ১৯৮৬ সালের ‘বিজয় ইমানুয়েল’ মামলার নজিরও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন।

ওই ঐতিহাসিক মামলায় সুপ্রিম কোর্ট ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে জাতীয় সংগীত না গাওয়া শিক্ষার্থীদের পক্ষে রায় দিয়েছিল। আদালত বলেছিল, জাতীয় সংগীত চলাকালে শিক্ষার্থীরা সম্মানজনকভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ধরনের বিঘ্ন না ঘটালে শুধু না গাওয়ার কারণে তাদের শাস্তি দেওয়া যায় না। বর্তমান শুনানিতে সেই নীতির প্রাসঙ্গিকতা নিয়েই আলোচনা হয়েছে।

মামলাটিতে ২০২৬ সালের ‘প্রিভেনশন অব ইনসাল্টস টু ন্যাশনাল অনার (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট’ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে ‘বন্দে মাতরম’-কে জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর মতো আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে জাতীয় গান পরিবেশনে বাধা দিলে বা গান পরিবেশনকারী কোনো সমাবেশে বিঘ্ন ঘটালে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ড, জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

আবেদনকারীর পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এস মুরলীধর যুক্তি দেন, ‘বন্দে মাতরম’-এর শেষ চারটি স্তবকে হিন্দু দেবী দুর্গা ও লক্ষ্মীর বন্দনা রয়েছে। তাঁর যুক্তি, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে কোনো নাগরিক পুরো গানটি গাইতে আপত্তি জানালে তাকে বাধ্য করা বা শাস্তির আওতায় আনা হলে তা সংবিধানে স্বীকৃত বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

তবে আদালত ‘বন্দে মাতরম’-এর ছয়টি স্তবকই জাতীয় গান হিসেবে গাওয়া উচিত কি না, সেই প্রশ্নে সরাসরি সিদ্ধান্ত দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। বিচারপতিরা ইঙ্গিত দিয়েছেন, জাতীয় গানের কাঠামো বা কোন স্তবক গাওয়া হবে—এ ধরনের বিষয় মূলত আইনসভা ও সরকারের নীতিনির্ধারণের আওতায় পড়ে। আদালত বরং সেই নির্দেশনা কার্যকর করতে গিয়ে মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে কি না, সেটি পরীক্ষা করতে আগ্রহী।

এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার ‘বন্দে মাতরম’-এর পূর্ণাঙ্গ ছয়টি স্তবক পরিবেশনের বিষয়ে নির্দেশনা জারি করে। একই সময়ে সংসদে পাস হওয়া ২০২৬ সালের সংশোধনী আইনের মাধ্যমে জাতীয় গানের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃত বাধা বা বিঘ্নকে শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনা হয়েছে।

টি এম কৃষ্ণ তাঁর আবেদনে এই নির্দেশনা ও সংশোধিত আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, ধর্মীয় ও বিবেকগত স্বাধীনতার বিষয়টি বিবেচনা না করে কাউকে জাতীয় গান গাইতে বাধ্য করা হলে তা ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সাংবিধানিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

শুনানির পর সুপ্রিম কোর্ট কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান জানতে চেয়েছে। ফলে ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়া, ধর্মীয় ও বিবেকগত স্বাধীনতা এবং শাস্তিমূলক বিধানের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে মামলাটি এখন পরবর্তী শুনানির দিকে এগোচ্ছে।

/এএসএফ