• ঢাকা
  • সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:১৯ এএম


কেন হঠাৎ স্পেন সীমান্তে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের ঢল, যা জানালো এএফপি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১ আগস্ট ২০২৬ ৫:০০ পিএম

স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতা সীমান্তে হঠাৎ করেই হাজারো অভিবাসনপ্রত্যাশীর ঢল নেমেছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্থল ও সমুদ্রপথে ইউরোপে প্রবেশের আশায় তারা সেউতার দিকে ছুটছেন। সেউতার স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ হাজার মানুষের এই ছোট ভূখণ্ডে গত কয়েক দিনে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রবেশ করেছেন।

শুক্রবার (৩১ জুলাই) প্রকাশিত বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এই আকস্মিক অভিবাসী সংকটের কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত মাত্র ১৮ দশমিক ৫ বর্গকিলোমিটারের সেউতা শহর স্পেনের অংশ। ফলে সেউতায় প্রবেশ মানেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে প্রবেশ। শহরটি থেকে জিব্রাল্টার প্রণালি পার হলেই ইউরোপের মূল ভূখণ্ড। এ কারণেই আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সেউতা দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপে প্রবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচিত।

মরক্কোর নাগরিক ফাতিমা জাহরা এএফপিকে বলেন, সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি শুনেছিলেন স্পেন-মরক্কো সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে। তখন তিনি তানজিয়ারে অবস্থান করছিলেন। সঙ্গে থাকা লোকজনকে নিয়ে ভাগ্য বদলের আশায় সেউতার উদ্দেশে রওনা দেন।

তিনি বলেন, “স্পেন ও মরক্কোর মধ্যকার সেউতা সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছে—সকালে ঘুম থেকে উঠেই এমন খবর কানে আসে। তানজিয়ারে ছিলাম আমি, সেখানে আমার সঙ্গে থাকা লোকজনকে বললাম, চলো সেউতায় যাই। ভাগ্যটা বদলানোর চেষ্টা করে দেখি।”

ইউরোপে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে জাহরা বলেন, “এখানে ভয়াবহ পরিবেশে কাজ করতে হয়।” তবে শেষ পর্যন্ত তিনি ইউরোপে প্রবেশ করতে পারেননি। মরক্কোর সীমান্তে নিরাপত্তা বাহিনীর ধাওয়ার মুখে তাকে ফিরে যেতে হয়।

আরেক অভিবাসনপ্রত্যাশী করিম জানান, কয়েকজন সফলভাবে সেউতায় প্রবেশ করেছেন—এমন খবর শুনেই তিনিও সীমান্তে যান। তার মতো আরও অনেকেই একই তথ্য পেয়ে সীমান্ত এলাকায় জড়ো হন।

এএফপির তথ্য অনুযায়ী, শুধু সীমান্তবর্তী এলাকা নয়, মারাকেশ ও কেনিত্রার মতো দূরবর্তী শহর থেকেও বহু মানুষ দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সেউতা সীমান্তে উপস্থিত হয়েছেন। হঠাৎ বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমে সীমান্তের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়ে এবং এরপর থেকেই দলে দলে মানুষ সেউতায় প্রবেশ করতে শুরু করেন।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গেছে, ইউরোপীয় ভূখণ্ডে প্রবেশের পর কয়েকজন তরুণ বিজয়সূচক ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে বলছেন, “বিদায় মরক্কো, স্বাগত স্পেন।” তাদের মধ্যে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীও ছিল।

এএফপি জানায়, সেউতায় স্প্যানিশ পুলিশকে খুব বেশি সক্রিয় হতে দেখা না গেলেও বৃহস্পতিবার রাত থেকে মরক্কোর পুলিশ কঠোর অবস্থান নেয়। সীমান্তে জড়ো হওয়া মানুষদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।

অন্যদিকে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি মাসের শুরুতে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে, সমুদ্রে আটক অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি সেউতা বা মেলিয়া সীমান্ত দিয়ে ফেরত পাঠানো যাবে না। এই রায়ও সীমান্তে মানুষের হঠাৎ ভিড়ের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এএফপি আরও জানায়, মরক্কো অংশে স্পেনের নিরাপত্তাকর্মীরা বড় বড় অভিবাসী দলকে ঠেকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ফনিদেক শহরে রাতভর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে। হাজারো মানুষ সীমান্ত ফটকের দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। এ সময় কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। রয়টার্স জানিয়েছে, অন্তত আটটি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সেউতায় সশস্ত্র বাহিনী ও সিভিল গার্ড মোতায়েনের ঘোষণা দেয় স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে শুক্রবার সেউতা সফর করেন স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ। তার সঙ্গে ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা।

সানচেজ বলেন, চলমান পরিস্থিতি ‘অপ্রত্যাশিত’ এবং সেউতার নিরাপত্তাকে মাদ্রিদের নিরাপত্তার মতোই গুরুত্ব দিয়ে রক্ষা করা হবে। তিনি জানান, গত বছর স্পেনে অবৈধ অভিবাসন প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছিল। ফলে বর্তমান পরিস্থিতি আগের প্রবণতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

অভিবাসনপ্রত্যাশীদের মরক্কোয় ফেরত পাঠাতে কত সময় লাগবে—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “যত দ্রুত সম্ভব।” মরক্কোর সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং দেশটি ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রয়োজনে এ বিষয়ে স্পেনের বিদ্যমান আইনেও পরিবর্তন আনার ইঙ্গিত দেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে সেউতা সংকট নিয়ে ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন জানিয়েছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় মরক্কোর সঙ্গে যোগাযোগ করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

ফ্রান্স ইতোমধ্যে স্পেন সীমান্তে তল্লাশি জোরদার করেছে। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ জানিয়েছেন, ইউরোপীয় সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী সংস্থা ফ্রন্টেক্সের মাধ্যমে স্পেনকে সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত।

অন্যদিকে ইতালি ও ডেনমার্ক সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভ্যন্তরীণ উন্মুক্ত সীমান্তব্যবস্থা থেকে স্পেনকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। এ সংকট নিয়ে ইউরোপীয় নেতাদের জরুরি আলোচনায় বসারও আহ্বান জানিয়েছে তারা।

উল্লেখ্য, উত্তর আফ্রিকায় মরক্কোর ভূখণ্ডে অবস্থিত সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের দুটি স্বায়ত্তশাসিত শহর। আফ্রিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র স্থলসীমান্ত হওয়ায় ইউরোপে প্রবেশ করতে চাওয়া অভিবাসনপ্রত্যাশীদের জন্য বহু বছর ধরেই এই দুই শহর গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত।

/এসএন