ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির সময় কোরআনের নির্দিষ্ট আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আয়াতগুলোর প্রতীকী অর্থ এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর প্রতি সম্ভাব্য কূটনৈতিক বার্তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। শোকানুষ্ঠানে বাংলাদেশসহ মোট নয়টি দেশের প্রতিনিধিদের সামনে ভিন্ন ভিন্ন আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।
আফগানিস্তান
আফগানিস্তানের জন্য তেলাওয়াত করা হয় সূরা আল-ফাতাহর ১ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘নিশ্চয়ই আমি আপনাকে (হে মুহাম্মদ) একটি স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বিজয় দান করেছি।’
আমির খান মুত্তাকির নেতৃত্বে তালেবান প্রতিনিধিদল হলে প্রবেশের সময় এই আয়াত তেলাওয়াত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রকে আফগানিস্তান থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই আয়াতকে তাদের বিজয়ের প্রতীকী স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের জন্য তেলাওয়াত করা হয় সূরা আলে ইমরানের ১৬৯-১৭০ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা নিজেদের রবের নিকট জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত। আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তাতে তারা আনন্দিত এবং তাদের পেছনে যারা এখনো তাদের সঙ্গে মিলিত হয়নি (অর্থাৎ জীবিত আছে), তাদের জন্য তারা এ সুসংবাদ গ্রহণ করে যে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লব এবং ওই আন্দোলনে নিহতদের আত্মত্যাগের প্রতি প্রতীকী সম্মান হিসেবেই এই আয়াত তেলাওয়াত করা হয়েছে।
ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিনের প্রতিনিধিদের সামনে তেলাওয়াত করা হয় সূরা বনি ইসরাইলের ১ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এর মাধ্যমে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং জেরুজালেমকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থানের প্রতীকী বার্তা দেওয়া হয়েছে।
কাতার
কাতারের জন্য পাঠ করা হয় সূরা আল-ফাতাহর ১ থেকে ৩ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘নিশ্চয় আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন আর আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আল্লাহ আপনাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে, বিশেষ করে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রতি প্রতীকী সমর্থন হিসেবেই এই আয়াত নির্বাচন করা হয়েছে।
পাকিস্তান
পাকিস্তানের প্রতিনিধিদলের সামনে তেলাওয়াত করা হয় সূরা বনি ইসরাইলের ৮০ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘বলো, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সংকটে ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্য পাকিস্তানকে উৎসাহিত করার প্রতীকী আহ্বান হিসেবে এই আয়াতকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তুরস্ক
তুরস্কের প্রতিনিধিদের জন্য তেলাওয়াত করা হয় সূরা আন-নিসার ৯৫ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘মু’মিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।’
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তুরস্কের ভূমিকার প্রতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত হিসেবেই এই আয়াত নির্বাচন করা হয়েছে।
রাশিয়া
রাশিয়ার প্রতিনিধিদলের জন্য তেলাওয়াত করা হয় সূরা আল-আহযাবের ২৩ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘মু’মিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সঙ্গে কৃত তাদের ওয়াদা বা অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে। অতঃপর তাদের কেউ কেউ নিজের মানত পূর্ণ করেছে (শহীদ হয়েছে) এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ইরানের কৌশলগত মিত্র হিসেবে রাশিয়ার অবস্থান এবং সংকটকালে সমর্থন অব্যাহত রাখার বিষয়টিকে এই আয়াতের মাধ্যমে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
সৌদি আরব
সৌদি আরবের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ এল খেরেজির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলের সামনে তেলাওয়াত করা হয় সূরা আলে ইমরানের ১৩ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘তোমাদের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে সেই দু’দল সৈন্যের মধ্যে যারা পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে দাঁড়িয়েছিল (বদর প্রান্তরে)। একদল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছিল এবং অপরদল ছিল কাফির। কাফিররা মুসলিমদেরকে প্রকাশ্য চোখে দ্বিগুণ দেখছিল। আল্লাহ যাকে ইচ্ছে স্বীয় সাহায্যের দ্বারা শক্তিশালী করে থাকেন, নিশ্চয়ই এতে দৃষ্টিমানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।’
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করেই এই আয়াত নির্বাচন করা হয়েছে।
ভারত
ভারতের প্রতিনিধিদলের সামনে তেলাওয়াত করা হয় সূরা আলে ইমরানের ১৭৩ নম্বর আয়াত। এর অর্থ, ‘এদেরকে লোকে বলেছিল, তোমাদের বিরুদ্ধে লোক জমায়েত হয়েছে, সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করো; কিন্তু এটা তাদের ঈমান আরও দৃঢ়তর করেছিল আর তারা বলেছিল, আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কত উত্তম কর্মবিধায়ক!’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আন্তর্জাতিক চাপ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরানের সঙ্গে ভারতের স্বাধীন দ্বিপাক্ষিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়টিকে এই আয়াতের মাধ্যমে প্রতীকীভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
/এসএন