জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি ভারতের সাবেক বিচারপতি এস মুরালিধরের নেতৃত্বে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি শিশুদের ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে হত্যার গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছরে ইসরাইলি সামরিক অভিযানে অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ জন ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে, যা ওই সময়ের মোট ফিলিস্তিনি মৃত্যুর প্রায় ৩০ শতাংশ।
তদন্ত কমিশনের দাবি, ইসরাইলের সামরিক অভিযান এবং পদ্ধতিগত কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের শামিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্য করে স্নাইপার মোতায়েন, নির্ভুল ড্রোন হামলা এবং এমন অবরোধ আরোপ করা হয়েছিল, যার ফলে ব্যাপক দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
কমিশনের তদন্তে নবজাতক ও প্রসূতি সেবা কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর পরিকল্পিত হামলার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মতে, এসব হামলার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকেই ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়েছে।
এ ছাড়া পশ্চিম তীরে শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা এবং নির্বিচারে আটকের ঘটনাও তদন্ত প্রতিবেদনে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, এটি একটি ‘জঘন্য প্রচারণামূলক রচনা’ এবং ‘মানহানিকর প্রহসন’।
অন্যদিকে কমিশন বলেছে, তাদের হাতে থাকা প্রমাণ ফিলিস্তিনি সমাজকে শিকড় থেকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্য ছিল— এমন অভিযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট।
ভারতীয় আইনি অঙ্গনে এস মুরালিধর দীর্ঘদিন ধরেই স্বাধীন ও আপসহীন বিচারক হিসেবে পরিচিত। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময় তিনি আহতদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মধ্যরাতে বিশেষ শুনানি নেন এবং বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের অভিযোগে শাসকদলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় দিল্লি পুলিশের সমালোচনা করেন।
ওই সময় তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘আমাদের চোখের সামনে এই শহরে আমরা আরেকটি ১৯৮৪ সালের পুনরাবৃত্তি হতে দিতে পারি না।’
এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে দিল্লি হাইকোর্ট থেকে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্টে বদলি করা হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। দিল্লি হাইকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন সেই বদলিকে একজন স্বাধীন বিচারপতির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বলে আখ্যা দিয়েছিল।
পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে উন্নীত না হয়েই উড়িষ্যা হাইকোর্ট থেকে অবসর নেন মুরালিধর।
বর্তমানে জেনেভাভিত্তিক এই কমিশনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। ২০২১ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ কমিশনটি গঠন করে। এর দায়িত্ব হলো সংঘাত-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করা এবং নিয়মিতভাবে জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে প্রতিবেদন জমা দেওয়া।
সূত্র: জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন
/এএসএফ