শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে শুক্রবার (২৪ জুলাই) বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা পাঁচটি শারীরিক সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘অটোনমিক নিউরোপ্যাথি’ নামের জটিল স্নায়ুরোগটি।
মায়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, অটোনমিক নিউরোপ্যাথি এমন একটি স্নায়বিক সমস্যা, যেখানে শরীরের স্বয়ংক্রিয় কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণকারী স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, হজম, মূত্রথলির কার্যকারিতা, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং যৌনস্বাস্থ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরবৃত্তীয় কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস অটোনমিক নিউরোপ্যাথির সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এছাড়া অটোইমিউন রোগ, অ্যামাইলয়েডোসিস, কিছু ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ, ক্যানসারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কেমোথেরাপির ওষুধ এবং কিছু বংশগত রোগও এ সমস্যার জন্য দায়ী হতে পারে।
মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোর কাছে সংকেত পৌঁছে দেয় স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র। এই যোগাযোগব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে নানা ধরনের উপসর্গ প্রকাশ পায়।
হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপ: হঠাৎ বসা বা শোয়া অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ালে মাথা ঘোরা, চোখে অন্ধকার দেখা বা অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন হতে পারে। পাশাপাশি বিশ্রামের সময়ও হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা ধীর হয়ে যেতে পারে।
পাচনতন্ত্র: খাবার খাওয়ার পর পেটে অস্বস্তি, বমিভাব, বমি, পেট ফাঁপা এবং পাকস্থলী ধীরে খালি হওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস বলা হয়। এছাড়া কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো সমস্যাও হতে পারে।
মূত্রাশয় ও যৌনস্বাস্থ্য: মূত্রাশয়ের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রস্রাব আটকে থাকা বা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বের হয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। পুরুষদের ক্ষেত্রে ইরেকটাইল ডিসফাংশন এবং নারীদের ক্ষেত্রে যৌন অনুভূতি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
ঘাম ও শরীরের তাপমাত্রা: অতিরিক্ত ঘাম হওয়া বা একেবারেই ঘাম না হওয়া—দুই ধরনের সমস্যাই দেখা দিতে পারে। এতে শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হতে পারে।
চোখের সমস্যা: উজ্জ্বল আলো থেকে অন্ধকারে গেলে চোখের মণি দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারায় রাতে গাড়ি চালানো বা অন্ধকারে স্পষ্ট দেখতে অসুবিধা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটোনমিক নিউরোপ্যাথিতে স্নায়ুর ক্ষতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হলেও সঠিক চিকিৎসা এবং জীবনযাপনে পরিবর্তনের মাধ্যমে এর লক্ষণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
এ জন্য ডায়াবেটিস থাকলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি হঠাৎ উঠে না দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে ওঠা, একবারে বেশি না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাবার খাওয়া, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বছরে অন্তত একবার স্নায়ুতন্ত্রের পরীক্ষা করানো উচিত।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, অটোনমিক নিউরোপ্যাথি সব সময় পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও দ্রুত শনাক্তকরণ, সঠিক চিকিৎসা এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে রোগের অগ্রগতি উল্লেখযোগ্যভাবে ধীর করা যায়।
/এসএন