• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ পিএম


পা অচল, হাতেও শক্তি নেই—হামাগুড়ি দিয়ে এইচএসসি পাস মনার

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১:৩৬ পিএম

পা দুটো অচল, বাঁ হাতেও নেই শক্তি। সোজা হয়ে দাঁড়ানো বা হাঁটতে পারেন না মনা বেগম (২০)। তাই ডান হাত ও ডান পায়ের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়েই চলাফেরা করেন তিনি। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ও দারিদ্র্যকে জয় করে এইচএসসি পাস করেছেন মনা। এখন তার স্বপ্ন ডিগ্রি পড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করা।

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার গোয়ালবাড়ী ইউনিয়নের রত্না চা-বাগানের ফাঁড়ি এলাপুর বাগানের দিনমজুর হারিছ মিয়া ও আমিনা বেগমের মেয়ে মনা। পাশের ফুলতলা ইউনিয়নের শাহ নিমাত্রা সাগরনাল-ফুলতলা কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ২.৫০ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি।

জন্মের পর থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে উঠছেন মনা। বাঁ হাত, বাঁ পা ও কোমরে শক্তি না থাকায় নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারেন না তিনি। দৈনন্দিন চলাফেরায় হামাগুড়িই তার একমাত্র ভরসা।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে প্রতিদিনই কঠিন সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। বাড়ি থেকে কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হতো গাড়িতে ওঠার জন্য। এরপর বাসে করে কলেজে যেতেন। কলেজ শেষে ফেরার সময়ও একইভাবে বাড়ি পর্যন্ত ফিরতে হতো।

মনা বেগম বলেন, ‘জন্ম থেকেই আমি প্রতিবন্ধী। পায়ে হাঁটতে পারি না। হাতের ওপর ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলাফেরা করি। এভাবেই কষ্ট করে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করেছি। এখন ডিগ্রিতে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু আমার বই কেনার মতো সামর্থ্য নেই।’

যাতায়াতের কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে গিয়ে গাড়িতে উঠতে হয়। ফেরার সময়ও একইভাবে আসতে হয়। এতে শরীর খুব দুর্বল হয়ে যায়। মাঝে মাঝে মনে হয় শ্বাস নিতে পারছি না।’

বর্তমানে ডিগ্রি (পাস) শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মনা। তবে ভর্তি, বই কেনা ও যাতায়াতের খরচ বহনের সামর্থ্য নেই পরিবারের। বাবা ও ছোট ভাই দিনমজুরি করে সংসার চালান। জরাজীর্ণ একটি ঘরে মা-বাবা ও ভাই-বোনদের সঙ্গে বসবাস করেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মনা বলেন, ‘আমি পড়াশোনা শেষ করে সরকারি চাকরি করতে চাই। কিন্তু প্রতিবন্ধী হওয়ার কারণে কোনো চাকরি পাচ্ছি না। আমাকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিলে আমি নিজের খরচ নিজে চালানোর চেষ্টা করব।’

সহজে চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা এবং পরিবারের জন্য একটি ভালো ঘরের প্রত্যাশা তার। মনা বলেন, একটি অটোরিকশা থাকলে কলেজে যাতায়াতের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত।

মনার মা আমিনা বেগম বলেন, ‘আমার প্রতিবন্ধী মেয়েটারে ছোট থেকে অনেক কষ্ট করে বড় করেছি, লেখাপড়া করিয়েছি। এখন অর্থের অভাবে আর পড়াতে পারছি না। মেয়েটার যদি একটা অটোরিকশা থাকত, তাহলে সে নিজে চলাফেরা করতে পারত।’

স্থানীয় বাসিন্দারাও মনার অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রশংসা করেছেন। তারা জানান, রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে হাতের ওপর ভর দিয়ে মনার চলাচল অত্যন্ত কষ্টকর। তার চলাচলের জন্য একটি অটোরিকশা হলে পড়াশোনাসহ দৈনন্দিন জীবন অনেক সহজ হবে।

জুড়ীর সামসুদ্দিন আহমদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিরঞ্জন চাষা মনার শৈশবের স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘মনা আমার বিদ্যালয়ে পড়ার সময় খুব ভালো ছাত্রী ছিল। লেখাপড়ার প্রতি তার প্রবল আগ্রহ ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সে অনেক কষ্ট করে হামাগুড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করত।’

শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক সংকট মনার সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ালেও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা এখনো তার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

/এএসএফ