প্রেমের কোনো সীমান্ত বা ভাষাগত বাধা নেই—এমন বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ হয়ে উঠেছেন চীনের নাগরিক ওয়াং ইউলাই (৩২)। সুদূর চীনের রাঙ্গগুই প্রদেশ থেকে ভালোবাসার টানে তিনি ছুটে এসেছেন বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায়। তার উদ্দেশ্য, দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রিয় মানুষ আনিকা আক্তারকে (২০) বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করা।
শনিবার (৩০ মে) মির্জাপুর উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের পাকুল্যা পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আলী হোসেনের মেয়ে আনিকা আক্তারের বাড়িতে পৌঁছান ওয়াং ইউলাই। তিনি পেশায় চীনের একটি স্কুলের শিক্ষক।
একজন চীনা যুবকের এভাবে প্রত্যন্ত গ্রামে এসে উপস্থিত হওয়ার খবর দ্রুত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি জানতে পেরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে উৎসুক মানুষজন আনিকাদের বাড়িতে ভিড় জমান। বিদেশি এই আগন্তুককে একনজর দেখতে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল দেখা দেয়।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত মাস আগে একটি জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাপের মাধ্যমে ওয়াং ইউলাই ও আনিকা আক্তারের পরিচয় হয়। শুরুতে সাধারণ বন্ধুত্বের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গভীর হয় এবং একপর্যায়ে প্রেমের সম্পর্কে রূপ নেয়।
দীর্ঘ সাত মাস অনলাইনে যোগাযোগের পর আনিকাকে সরাসরি দেখার এবং তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন ওয়াং ইউলাই। সেই উদ্দেশ্যে এক মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন।
বাংলাদেশে এসে নিজের অনুভূতির কথা জানাতে গিয়ে ওয়াং ইউলাই বলেন, ‘আমি আনিকাকে মনে-প্রাণে ভালোবাসি। আমি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনে পবিত্র ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে আনিকাকে বিয়ে করতে চাই এবং সুখে-শান্তিতে সংসার করতে চাই। এ দেশে আসার পর আনিকার পরিবারের কাছ থেকে আমি যে আন্তরিক ভালোবাসা পেয়েছি, তা অতুলনীয়।’
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি কিছু ভুয়া চীনা নাগরিক বাংলাদেশে প্রতারণা বা মানবপাচারের মতো অপরাধে জড়িত থাকলেও তিনি সম্পূর্ণ বৈধ ও আইনি প্রক্রিয়ায় বিয়ে করতে চান। তার ভাষ্য, চীনের আইন অত্যন্ত কঠোর এবং তিনি সব নিয়ম মেনে আনিকাকে বিয়ে করে নিজ দেশে নিয়ে যেতে আগ্রহী।
অন্যদিকে, চীনা প্রেমিককে নিজের বাড়িতে পেয়ে উচ্ছ্বসিত আনিকা আক্তারও। কলেজপড়ুয়া এই তরুণী বলেন, ‘অনলাইনে পরিচয়ের পর আমাদের মধ্যে খুব ভালো বোঝাপড়া তৈরি হয়। আমরা একসঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সে ৩০ তারিখে বাংলাদেশে আসার কথা দিয়েছিল এবং ঠিক ওই দিনই এসেছে। সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে আগে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করবে, তারপর আমাকে বিয়ে করবে। আমি তাকে বিয়ে করে চীনে যেতে মানসিক ও আইনিভাবে প্রস্তুত।’
আনিকার পরিবার জানিয়েছে, বর্তমানে এক মাসের ভিসায় বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ওয়াং ইউলাই। তার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে। বিয়ের পর কিছুদিন শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করবেন তিনি। এরপর প্রয়োজনীয় আন্তর্জাতিক কাগজপত্র ও ভিসা সংক্রান্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আনিকাকে সঙ্গে নিয়ে চীনে ফিরে যাবেন।
এ বিষয়ে মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, চীনা নাগরিক ওয়াং ইউলাই এবং আনিকার পরিবারের সদস্যরা সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য থানায় এসেছিলেন। তিনি বলেন, ‘ওই চীনা নাগরিক তার বৈধ পাসপোর্ট ও ভিসার কাগজপত্র আমাদের দেখিয়েছেন। সব নথিপত্র বৈধ রয়েছে এবং তিনি বর্তমানে মেয়েটির পরিবারের হেফাজতেই নিরাপদে অবস্থান করছেন।’
প্রসঙ্গত, গত ৩ মে মির্জাপুর উপজেলার আনাইতারা ইউনিয়নের চামারি ফতেপুর গ্রামে দুই ব্যক্তি নিজেদের চীনা নাগরিক পরিচয় দিয়ে বিয়ের উদ্দেশ্যে গিয়ে গ্রামবাসীর জিজ্ঞাসাবাদের মুখে সেখান থেকে চলে যান। তবে ওয়াং ইউলাইয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র বৈধ এবং তার উদ্দেশ্যও স্বচ্ছ হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন ও এলাকাবাসী বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন।
/এসএন