নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ক্রমেই নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। পাইকারি ও খুচরা—কোনো বাজারেই স্বস্তি নেই। মূল্যস্ফীতির চাপ সামলাতে গিয়ে স্বল্প আয়ের মানুষ হিমশিম খাচ্ছে, আর সীমিত আয়ের বিপরীতে বাড়তি ব্যয়ের ভারে অনেক পরিবারের সংসার টালমাটাল হয়ে উঠছে।
চাল, ডিম, ভোজ্যতেল, সবজি, মাছ-মাংস ও এলপিজি গ্যাসসহ প্রায় সব পণ্যের দাম নতুন করে বেড়েছে। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারে। ব্যয় সামাল দিতে বাধ্য হয়ে অনেকেই খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টি কমাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।সবজি ও এলপিজিতে বড় উল্লম্ফনরাজধানীর খুচরা বাজারে গত তিন মাসে কিছু সবজির দাম সর্বোচ্চ ১৬৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একই সময়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে প্রায় ৪৩ শতাংশ।ব্যবসায়ীদের মতে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন ব্যয় বেড়েছে, যার প্রভাব পাইকারি থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত পড়েছে। ডিজেলের দাম লিটারে ১৫ টাকা বাড়ার পর ট্রাকভাড়া কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি বৃষ্টির কারণে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সবজির দামও কমছে না।
আবারও ৯ শতাংশের ঘরে মূল্যস্ফীতিবাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ ভোক্তা মূল্যসূচক অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে দেশের গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯.০৪ শতাংশে, যা মার্চে ছিল ৮.৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসেই মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০.৩৩ শতাংশ। গত বছরের এপ্রিলের তুলনায় এখন ১০০ টাকার পণ্য কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ১০৯ টাকা। গত ছয় মাসের মধ্যে পাঁচ মাসই মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি বা তার বেশি রয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ৮–৯ শতাংশে থাকায় মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে এবং ক্রয়ক্ষমতা সংকুচিত হচ্ছে।বাজারে পণ্যের দাম কোথায় দাঁড়িয়েছেগত তিন মাসে রাজধানীর বাজারে—কাঁচা পেঁপে কেজিতে ১৫০–১৬৭% বেড়ে ৮০–১০০ টাকাবেগুন ৬০–১০০% বেড়ে ৮০–১২০ টাকাকাঁচকলা হালি ৫০% বেড়ে ৬০ টাকাডিম প্রতিডজন ২১–২২% বেড়ে ১৪০–১৪৫ টাকাখোলা চিনি কেজি ১১০ টাকাসয়াবিন তেল বোতল ২০০ টাকা, খোলা ১৮৬–১৯৫ টাকামাঝারি মানের চাল ৬০–৬৮ টাকা কেজিএদিকে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত দাম ১,৯৪০ টাকা হলেও ভোক্তাদের দিতে হচ্ছে আরও ২০০–৩০০ টাকা বেশি।পরিবারের খরচে কাটছাঁটরাজধানীর বাড্ডার এক বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, বাড়তি খরচের কারণে তিনি এখন রুই-কাতলা মাছ কেনা বন্ধ করে কমদামি মাছেই নির্ভর করছেন। মাস শেষে মুদি দোকানে বকেয়া জমে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তাভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আলোচনা নয়—কার্যকর বাজার তদারকি জরুরি। নিত্যপণ্যে কর-ভ্যাট কমানো, টিসিবি ও ওএমএস কার্যক্রম বাড়ানো এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছেন তারা।বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে খাদ্যনিরাপত্তা ও নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও সংকটে পড়বে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি মূল্য ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা, বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং খাদ্য আমদানিতে শুল্ক কমানোসহ সমন্বিত পদক্ষেপ ছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
/বিএসএস