• ঢাকা
  • সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৩৯ পিএম


নিজের সন্তান নেই, লালন-পালন করেছেন ২০টির বেশি এতিম শিশু

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২ নভেম্বর ২০২৬ ১০:৪৯ পিএম

চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার ঘোলদাড়ী গ্রামের নির্জন মাঠে মাটির নিচে সুড়ঙ্গসদৃশ একটি কক্ষে ২৬ বছর ধরে সাধনা করছেন লাভলী শাহ ফকির রানী নামে এক নারী। ‘বিশ্ব ধ্যান মঞ্জিল’ নামে আশ্রমটিতে ধ্যানের পাশাপাশি এতিম ও পথশিশুদের লালন-পালন এবং মানবসেবায় জীবন কাটিয়েছেন বলে দাবি তাঁর।

ঘোলদাড়ী গ্রামের জনবসতিহীন ‘বেলের মাঠে’ সাড়ে সাত শতক জমির ওপর গড়ে উঠেছে আশ্রমটি। টিনের চালার নিচে সিঁড়ি দিয়ে নামলেই পাওয়া যায় অন্ধকার সুড়ঙ্গের মতো একটি কক্ষ। ২০০০ সালে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন লাভলী শাহ। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রাজবাড়ীর মাহবুব আলম বাচ্চু ও রংপুরের আলভী বেগম নামে দুই খাদেম।

২৬ বছর ধরে সাধনা ও এতিম শিশুদের লালন-পালন

মাহবুব আলম বাচ্চু জানান, তিনি ও লাভলী শাহ দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে সেখানে সাধনা করছেন। আশ্রমে সাধুসঙ্গ ও ফলসেবার আয়োজনও করা হয়।

নিজের গর্ভে সন্তান না থাকলেও জীবনে কুড়িয়ে পাওয়া ২০ জনের বেশি এতিম ও পথশিশুকে লালন-পালন করে বড় করেছেন লাভলী শাহ। বর্তমানে বার্ধক্যজনিত নানা অসুস্থতায় ভুগলেও সাধনা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। মাহবুব আলম বাচ্চুর ভাষ্য, একবার টানা ৪১ দিন সুড়ঙ্গে ধ্যানে মগ্ন ছিলেন লাভলী শাহ।

ইরাক থেকে বাংলাদেশে আসার দাবি

লাভলী শাহর দাবি, শৈশবে তিনি ইরাকে ছিলেন। পরে পাকিস্তান ও ভারত হয়ে বাংলাদেশে আসেন। পাঁচ বছর বয়সে ইরাকে থাকার স্মৃতি তাঁর মনে রয়েছে। ১১ বছর বয়সে এক সাধু তাঁর নাম রাখেন লাভলী এবং তাঁর কাছ থেকেই আধ্যাত্মিক দীক্ষা নেন। পরবর্তী সময়ে লালন শাহের দর্শনে অনুপ্রাণিত হন তিনি।

তবে নিজের বয়স, বাবা-মা ও জন্মপরিচয় সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেন না এই সাধক।

লাভলী শাহ ফকির রানী জানান, ১৯৭৯ সাল থেকে নির্দিষ্ট স্থানটির সন্ধান করছিলেন তিনি। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ২০০০ সালে ঘোলদাড়ীর এই নির্জন মাঠে আসেন। দিনের বেলা শিশুদের সঙ্গে সময় কাটাতেন, আর রাতে মাটির নিচের কক্ষে সাধনা করতেন।

আশ্রমের মূল শিক্ষা মানবধর্ম

আশ্রমে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের দেবদেবীর মূর্তি ও ছবি রয়েছে। লাভলী শাহর ভাষ্য, মানবধর্মই সবচেয়ে বড় ধর্ম। জাতপাত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের ভেদাভেদ নয়, মানুষের প্রতি ভালোবাসাই তাঁদের আশ্রমের মূল শিক্ষা।

তবে নির্জন আশ্রমে সাধনার পথ সব সময় সহজ ছিল না। লাভলী শাহ জানান, অতীতে একাধিকবার ডাকাত ও সন্ত্রাসীদের কবলে পড়েছেন তিনি। পিস্তল ঠেকিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া লালন শাহকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রহ করা একটি মূল্যবান ডায়েরিও হারিয়ে গেছে।

অনুদান নয়, মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বাঁচতে চান

লাভলী শাহ জানান, সরকারের কাছ থেকে কোনো অনুদান পাননি তিনি। তবে এ নিয়ে তাঁর কোনো অভিযোগ নেই। মানুষের ভালোবাসা নিয়েই বাকি জীবন কাটাতে চান। মৃত্যুর পর আশ্রমেই তাঁকে রেখে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছেন এই সাধক।

লাভলী শাহ ফকির রানী বলেন, “আমার কাছে সব মানুষ সমান। মানবধর্মই বড় ধর্ম। জীবনে অনেক কষ্ট করেছি, এতিম শিশুদের নিজের সন্তানের মতো বড় করেছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। মৃত্যুর পরও এই আশ্রমের মাটিতেই থাকতে চাই।”

/এএসএফ