• ঢাকা
  • রোববার, ১১ অক্টোবর ২০২৬, ০২:৪৬ পিএম


বিএসটিআইয়ের অনুমোদন ছাড়াই আইসক্রিম তৈরি, বাজারে ছড়াচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ পণ্য

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ১:০০ পিএম

পিরোজপুরে ভুয়া নাম-ঠিকানা ও কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ব্যবহার করে বাজারজাত করা হচ্ছে অনুমোদনহীন আইসক্রিম ও বিভিন্ন ধরনের শিশুখাদ্য। জেলার নেছারাবাদ উপজেলায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আইসক্রিম তৈরির পাশাপাশি পটুয়াখালী ও বাগেরহাটের ঠিকানা ব্যবহার করে এসব পণ্য বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। এমনকি পার্শ্ববর্তী নাজিরপুর উপজেলার একটি অস্তিত্বহীন কারখানার নাম ব্যবহার করেও বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে বিভিন্ন শিশুখাদ্য। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও অভিভাবকেরা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নেছারাবাদ উপজেলার উত্তর-পশ্চিম সোহাগদল গ্রামের এনডব্লিউ মাদ্রাসার পাশে একটি জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে ‘লুচি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি’ নামে একটি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আইসক্রিম তৈরি করা হচ্ছে। পাশাপাশি এসব পণ্য তৈরিতে অননুমোদিত কৃত্রিম রং ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, কারখানায় উৎপাদিত আইসক্রিমের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং খুচরা বিক্রয়মূল্যের কোনো উল্লেখ নেই। ‘সাদ আইসক্রিম’-এর চকবার ও কোকোনাট আইসক্রিম, ‘নছিলা আইসক্রিম’ এবং বিভিন্ন ধরনের কাপ আইসক্রিমের মোড়কে পটুয়াখালীর ‘নিউ নন্দিনী’ ও ‘হেতালিয়া’ নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া বাগেরহাটের ঠিকানা ব্যবহার করে ‘ক্যাটবেরী আইসক্রিম’ বাজারজাত করার তথ্যও পাওয়া গেছে।

শিশুদের আকৃষ্ট করতে ‘রোবট’, ‘দধি’ ও ‘স্পিড’ নামেও বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরি ও বিক্রি করা হচ্ছে। আকর্ষণীয় নাম ও মোড়কে এসব পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়লেও এগুলোর উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

কারখানায় তৈরি এসব পণ্য উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশের দোকানগুলোতে সরবরাহ করেন তৌহিদ নামের এক বিক্রেতা। দোকানগুলোতে পণ্য সরবরাহের বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, সোহাগদল গ্রামের আবুল হোসেনের কারখানায় এসব পণ্য তৈরি হয়। তৌহিদের ভাষ্য, তিনি কারখানা থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি ও সরবরাহ করেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তৌহিদ ছাড়াও আরও কয়েকজন কর্মী কারখানাটিতে তৈরি পণ্য বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করছেন। এভাবে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এসব আইসক্রিম ও শিশুখাদ্য পৌঁছে যাচ্ছে।

কারখানাটির সরকারি অনুমোদন ও পণ্যের বৈধ মোড়ক না থাকার বিষয়ে মালিক আবুল হোসেন নিজের বক্তব্যে জানান, তার কারখানার কোনো সরকারি অনুমোদন নেই। পণ্য বাজারজাত করার জন্য নির্দিষ্ট কোনো বৈধ মোড়কও নেই বলে স্বীকার করেন তিনি। আবুল হোসেন বলেন, ছোট পরিসরে কারখানাটি পরিচালনা করছেন এবং এভাবে কারখানা চালানো তার ভুল হয়েছে।

এদিকে অনুসন্ধানে শিশুখাদ্য বাজারজাতকরণে আরও একটি জালিয়াতির তথ্য সামনে এসেছে। নাজিরপুর উপজেলার জয়পুর গ্রামের ঠিকানা ব্যবহার করে ‘আশা ফুড প্রোডাক্টস’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মোড়কে শিশুখাদ্য বিক্রি করা হচ্ছে। তবে অনুসন্ধান করে ওই গ্রামে এ ধরনের কোনো কারখানার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নাজিরপুরের এক বরফকলের মালিক ফুয়াদ। তিনি বলেন, নাজিরপুর এলাকার নাম ব্যবহার করে ভুয়া মোড়কে শিশুখাদ্য বিক্রি করা হচ্ছে, যা স্পষ্টতই প্রতারণা। এ ধরনের জালিয়াতির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যকে হুমকির মুখে ফেলা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ফুয়াদের দাবি, প্রশাসনের দ্রুত তদন্ত করে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা উচিত।

পণ্যের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় স্থানীয় অভিভাবক ও সচেতন মহলের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আল আমিন ও রিয়াজ হোসেন নামের দুই স্থানীয় বাসিন্দা জানান, আকর্ষণীয় মোড়ক দেখে শিশুরা এসব পণ্য কিনে খাচ্ছে। তাঁদের আশঙ্কা, এসব পণ্য খাওয়ার ফলে শিশুদের পেটের পীড়া, ডায়রিয়া ও কাশিসহ বিভিন্ন শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এ বিষয়ে নেছারাবাদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশিক আহমেদ বলেন, অনুমোদন ছাড়া এবং ভুয়া মোড়ক ব্যবহার করে শিশুখাদ্য উৎপাদন করা গুরুতর অপরাধ। সুনির্দিষ্ট নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেলে দ্রুত সরেজমিনে অভিযান চালিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, শিশুদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় অবৈধ আইসক্রিম কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক অভিযান চালানো জরুরি। একই সঙ্গে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে বাজারজাত করা পণ্যগুলোর প্রকৃত উৎস শনাক্ত, পণ্যের নমুনা পরীক্ষা এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

/এসএন