• ঢাকা
  • সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:২০ পিএম


‘বান্ধবীকে’ বিয়ের আশায় পুরুষ হওয়ার চেষ্টা, অ’স্ত্রোপচারের পর তরুণীর মৃ’ত্যু

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৭:৫১ পিএম

অন্য এক যুবতীকে বিয়ে করার উদ্দেশ্যে নারী থেকে পুরুষ হওয়ার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে স্তন অপারেশন করিয়েছিলেন রোজি আক্তার লিজা (৩১)। অস্ত্রোপচারের কয়েক ঘণ্টা পর তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

নিহত লিজা বরিশালের গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রব হাওলাদার (রব রাজ)-এর মেয়ে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে ঢাকার পান্থপথ গ্রিন রোডের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিজার অস্ত্রোপচার হয়। পরদিন রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে তার মৃত্যু হয়।

রোববার বিকেলে পরিবারের সদস্যরা লিজার মরদেহ নিয়ে এলাকায় ফিরলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। পরে দ্রুততার সঙ্গে ওই দিন সন্ধ্যার মধ্যেই তার দাফন সম্পন্ন করা হয়।

এলাকাবাসী ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, নারী হিসেবে জন্ম হলেও লিজার আচরণ ছিল ছেলেদের মতো। তিনি ছেলেদের মতো চুল কাটাতেন। ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকার বাসিন্দা জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার নামে এক যুবতীর নিয়মিত যাতায়াত ছিল লিজাদের বাড়িতে। লিজা জেনিফাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মনে করতেন বলে সূত্রের দাবি। একইভাবে জেনিফাও লিজাকে স্বামী হিসেবে দেখাশোনা করতেন।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর আগে একই ধরনের সম্পর্কের কারণে লিজা তার আপন ভাইয়ের স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন। পরে তারা আবার বাড়িতে ফিরে আসেন। এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জেনিফার সঙ্গে লিজার পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে জেনিফা প্রায়ই লিজাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন এবং মাসের পর মাস সেখানে একসঙ্গে থাকতেন। লিজার বাবা-মা বিষয়টি জানলেও জেনিফা কৌশলে তাদের আপন করে নেওয়ায় তারা বিষয়টি নিয়ে নীরব ছিলেন।

জেমিনি ওরফে জেনিফা আক্তার জানান, তারা একে অপরের বাসায় যাতায়াত করতেন এবং একসঙ্গেও থাকতেন। লিজা ঢাকায় হরমোনের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। লিজার মা, বাবা ও বোন স্তন অপারেশনের জন্য দেড় লাখ টাকা দেন। ওই অর্থ দিয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর ঢাকার পান্থপথের ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ‘সরফরাজ’ নাম দিয়ে লিজাকে ভর্তি করা হয়।

জেনিফা জানান, অস্ত্রোপচারের আগে হাসপাতালের সম্মতিপত্রে তিনি লিজার স্ত্রী হিসেবে স্বাক্ষর করেন। একজন নারী হয়ে আরেকজন নারীকে স্ত্রী পরিচয়ে সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করার বিষয়ে জেনিফার দাবি, লিজার মা-বাবার সম্মতি নিয়েই তিনি সেখানে স্বাক্ষর করেছিলেন।

তবে লিজার বাবা আব্দুর রব হাওলাদার এ বিষয়ে ভিন্ন কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সে (জেনিফা) যে স্বাক্ষর করবে, তার স্বাক্ষরে যে অপারেশন হবে সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি লিজার নাম যে সরফরাজ রাখা হয়েছে তা আজই কেবল জেনেছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘লিজা অপারেশন করে পুরুষ হয়ে জেনিফাকে বিয়ে করবে এমনটা ওর (লিজা) মায়ের কাছে শুনেছি।’

আক্ষেপ প্রকাশ করে আব্দুর রব বলেন, ঘরের যেকোনো বিষয়ে তার কোনো পরামর্শ নেওয়া হয় না। পরিবারের সব সদস্য তাকে আলাদা চোখে দেখেন বলেও তিনি জানান।

লিজার মা ফজিলা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ে লিজা ছোট বেলা থেকেই কোনো ছেলেকে পছন্দ করতো না। তাকে জোর করে দুইবার বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। কোথাও সে (লিজা) সংসার করেনি। ছেলেদের সাথে সঙ্গ দেওয়া কিংবা ঘর সংসার করার কোন মনমানসিকতাই তার ছিল না।’

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে জেনিফা আমাদের বাড়িতে এসে লিজার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে বেড়াত। এই কারণে লিজার অপারেশনের দায়িত্ব আমরা জেনিফার ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম।’

এ ধরনের কর্মকাণ্ড ইসলাম সমর্থন করে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ফজিলা বেগম বলেন, ইসলাম এটি সমর্থন করে না, তা তিনি জানেন। তবে মোবাইলে বর্তমানে এ ধরনের ঘটনা শত শত দেখা যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অন্যদিকে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের দেওয়া মৃত্যু সনদে দেখা গেছে, গত ৩ সেপ্টেম্বর লিজাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ওই সনদে তার নাম ‘সরফরাজ’ এবং লিঙ্গ পুরুষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

মৃত্যু সনদে দেওয়া হাসপাতালের নম্বরে যোগাযোগ করা হলে লিমন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে হাসপাতালের অ্যাডমিন হিসেবে পরিচয় দেন। বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জিএমের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।

পরে ইউনিহেলথ স্পেশালাইজড হাসপাতালের জিএম বিশ্বজিত বৈদ্যের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুরো বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি এ বিষয়ে কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি ওই রোগী যে চিকিৎসকের অধীনে ভর্তি হয়েছিলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

এরপর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ডা. মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা জানিয়ে ‘পরে ফোন করব’ বলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।

/এসএন