রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোববার (২৩ আগস্ট) ভোরে তাদের আটক করা হয়।
আটক দুজন হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়ার সিদ্ধার্থ (২০) ও মুগ্ধ (২৩)।
রোববার দুপুরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে মহানগর পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে ওই পরিবারের চার সদস্যকে একে একে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, চারজনকে হত্যার খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় অভিযান শুরু করেন। অভিযানের একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) শেষ রাতের দিকে গণপতি চক্রবর্তীর নির্মাণাধীন বাড়ির ছাদে বসে মাদক সেবন ও আড্ডা দিচ্ছিলেন সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ। তারা প্রায়ই সেখানে এ ধরনের কর্মকাণ্ড করতেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওইদিন গণপতি চক্রবর্তী তাদের মাদক সেবনের বিষয়টি দেখে ফেলেন। এরপর প্রথমে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। পরে শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা বাইরে বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করেন তারা।
এরপর মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী বেরিয়ে এলে তাকেও হত্যা করা হয়। সবশেষ ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়ম তাদের চিনে ফেলায় তাকেও হত্যা করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
চারজনকে হত্যার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ বাড়ির ভেতরে ঢুকে স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট করে পালিয়ে যান বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ কমিশনার আবদুল মাবুদ জানান, এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত আছে কি না কিংবা হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) দিনগত রাতে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত গণপতি চক্রবর্তীর বয়স ছিল ৬৫ বছর।
পুলিশ জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় তার নিজস্ব দোতলা বাড়ির ছাদে। তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০) এবং মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থীর (২৫) মরদেহ ছিল ছাদে ওঠার সিঁড়িতে। আর ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ পাওয়া যায় খাটের নিচে।
স্থানীয়রা জানান, স্কুলশিক্ষকের বাড়িটি কয়েকদিন ধরে তালাবদ্ধ ছিল। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে পরিবারের সদস্যদের প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। শনিবার রাত ৯টার দিকে বাড়ির ভেতর থেকে দুর্গন্ধ পাওয়া গেলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়।
পরে গণপতি চক্রবর্তীর অন্য স্বজন ও পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে বাড়ির তালা ভেঙে পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করে। এ সময় বাড়ির ভেতরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ও আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায়।
নিহত প্রীতিলতা চক্রবর্তীর বোন পূজা চক্রবর্তী জানান, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে মুঠোফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছিল। এরপর শনিবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সব ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
ফোনে কাউকে না পেয়ে রাত ৯টার দিকে তিনি তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যান। সেখানে গিয়ে প্রধান ফটকটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ দেখতে পান।
পরে ৯৯৯ নম্বরে ফোন করলে সেখান থেকে কোতোয়ালি থানায় যোগাযোগ করতে বলা হয়। পূজা চক্রবর্তী আরও জানান, তখন বাড়িটির বিদ্যুৎ সংযোগও বিচ্ছিন্ন ছিল।
খবর পেয়ে কোতোয়ালি থানার পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। তারা বিভিন্ন আলামত সংগ্রহের পাশাপাশি ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তদন্ত শুরু করে।
জানা গেছে, গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন তিনি। অবসরের পর রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন।
তার মেয়ে আগমনী চক্রবর্তী প্রার্থী কারমাইকেল কলেজের মাস্টার্স ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। মাস্টার্স শেষ করে তিনি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
/এসএন