টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার এক মা দুই সন্তানকে নিয়ে কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। ঘরে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়ায় বিছানাপত্র, আসবাবপত্র সব ভিজে যায়। এমন পরিস্থিতিতে রান্নারও কোনো সুযোগ ছিল না।
ঘটনাটি ঘটেছে বাঁশখালী উপজেলার পুঁইছড়ি ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে। তসলিমা আক্তার নামে ওই নারী বুধবার (৮ জুলাই) রাতটি দুই বছর বয়সী মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া এবং ১৩ বছর বয়সী ছেলে বোরহান উদ্দিনকে নিয়ে অটোরিকশাতেই কাটান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, টানা বৃষ্টিতে তাদের ঘরে কোমরসমান পানি জমে যায়। চুলা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় রান্না করা সম্ভব হয়নি। দুই সন্তানকে নিরাপদে রাখার চিন্তায় তসলিমা আক্তার ঘর ছেড়ে উঁচু স্থানের খোঁজ করেন। আশপাশে নিরাপদ কোনো জায়গা না পেয়ে একটি কালভার্টে আশ্রয় নেন, যেখানে স্থানীয় আরও অনেকে গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অবস্থান করছিলেন।
তসলিমার স্বামী শাহাবুদ্দিন পানির হাত থেকে রক্ষা করতে নিজের সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ওই কালভার্টে রেখে দিয়েছিলেন। পরে সেটিকেই পরিবারের অস্থায়ী আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করেন তারা।
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায়ও দেখা যায়, অটোরিকশার একটি আসনে কাঁথা মুড়িয়ে ঘুমিয়ে আছে ছোট্ট জান্নাতুল মাওয়া। পাশে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছিল তার বড় ভাই বোরহান উদ্দিন। একই কালভার্টে ত্রিপল টাঙিয়ে আরও কয়েকটি পরিবার গরু-ছাগল ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে অবস্থান করছিল।
আশ্রয় নেওয়া কয়েকটি পরিবার রান্না করা খাবারের ব্যবস্থা করতে পারলেও অধিকাংশ মানুষ শুকনো খাবার—মুড়ি, চিড়া ও কলা খেয়েই দিন পার করছেন। অনেকেই জানান, আগে থেকে পরিস্থিতির ভয়াবহতা সম্পর্কে ধারণা থাকলে তারা প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে পারতেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত সোমবার থেকে বাঁশখালীর পুঁইছড়ি, ছনুয়া, শেখেরখীল, গন্ডামারা ও শীলকূপসহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বসতবাড়ি, সড়ক, পুকুর ও জলাশয়ে পানি ঢুকে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। পানিবন্দী পরিবারগুলোর অধিকাংশই দুই দিন ধরে রান্না করতে পারেনি এবং শুকনো খাবারের ওপর নির্ভর করে দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি ত্রাণ সহায়তা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় অনেক পরিবার এখনো কোনো সহায়তা পায়নি। ফলে খাদ্যসংকট নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তসলিমার স্বামী শাহাবুদ্দিন বলেন, “বুধবার রাতে হঠাৎ করে ভিটায় পানি উঠে যায়। কিছু সময়ের মধ্যেই কোমরসমান পানি হয়ে যায়। তখন আর কোনো উপায় না দেখে কালভার্টের ওপর নিজেদের অটোরিকশায় আশ্রয় নিই। জানি না আর কত দিন এভাবে থাকতে হবে।”
স্থানীয় বাসিন্দা নজির আহমদ বলেন, “জীবনে এমন দুর্ভোগ দেখিনি। পাহাড়ি ঢলে সবকিছু তছনছ হয়ে গেছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে মানুষ চরম কষ্টে আছে। কবে এই দুর্ভোগ শেষ হবে, তা কেউ জানে না।”
/এএসএফ