• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ০৪:০৭ এএম


কক্সবাজারে পাহাড়ধ’সে নিহ’ত বেড়ে ১১, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহা’নি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ জুলাই ২০২৬ ৬:৪৮ পিএম

টানা ভারি বর্ষণের কারণে কক্সবাজারে একাধিক স্থানে পাহাড়ধসে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার তিনটি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জন, কক্সবাজার শহরে একজন, পেকুয়ায় একজন শিশু এবং মঙ্গলবার দুপুরে সদর উপজেলার দরিয়ানগরে আরও এক নারীর মৃত্যু হয়েছে।

মঙ্গলবার (৭ জুলাই) দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগরে পাহাড়ধসে এক নারী নিহত হন। এ ঘটনায় শিশুসহ চারজন আহত হয়েছেন।

এর আগে রোববার রাত ১টা থেকে সাড়ে ৩টার মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্প এবং কক্সবাজার শহরের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পৃথক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এছাড়া পেকুয়া উপজেলায় সোমবার দুপুরে পাহাড়ধসে এক শিশুর মৃত্যু হয়।

উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৬ ব্লকে সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি ঘটে। রাত দেড়টার দিকে পাহাড়ের বিশাল একটি অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের বসতঘরের ওপর। এতে মুহূর্তের মধ্যে ঘরটি মাটিচাপা পড়ে যায়। খবর পেয়ে উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা উদ্ধার অভিযান চালিয়ে কামাল হোসাইন (৪৪), তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম (৩৯) এবং তাদের চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাসের মরদেহ উদ্ধার করেন।

ঘটনার সময় পরিবারের ১০ সদস্য ঘুমিয়ে ছিলেন। তাদের মধ্যে সাতজন অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও সবাই গুরুতর আহত হয়েছেন।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা যুগান্তরকে জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অত্যন্ত দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন। এ ঘটনায় তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং আশঙ্কাজনক অবস্থায় দুজনকে উদ্ধার করা হয়।

এই ঘটনার কিছুক্ষণ পর রাত ২টার দিকে রাজাপালং ইউনিয়নের কুতুপালং ৭ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ডি-৭ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসে একরাম (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই ক্যাম্পের মোহাম্মদ রশিদের ছেলে।

এর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বালুখালী ১১ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে পাহাড়ধসে একই পরিবারের চারজন প্রাণ হারান। নিহতরা হলেন—আব্দুর রাজ্জাকের দুই মেয়ে উম্মে হাবিবা (২৭) ও তানজিনা আক্তার (১৩) এবং মোহাম্মদ রশিদের দুই ছেলে মোহাম্মদ রিহান (৫) ও হারুনুর রশিদ (৩)।

এদিকে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে রাত ৩টার দিকে কক্সবাজার শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তার ঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর নিহত হন।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের খলিফা মুরা আলিম্যার ঝিরি এলাকায় সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে পাহাড়ধসে মো. মিনহাজ উদ্দিন (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে একই এলাকার কলিম উল্লাহর ছেলে। শিশুটির মৃত্যুতে পরিবার ও এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী যুগান্তরকে জানান, ঘরচাপা পড়া অবস্থায় একই পরিবারের তিনজনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। তবে আলী আকবরের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান জানান, এখন পর্যন্ত পাহাড়ধসের ঘটনায় রোহিঙ্গা নারী ও শিশুসহ মোট ৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহগুলো কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। ময়নাতদন্ত শেষে সেগুলো স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

তিনি আরও বলেন, আবহাওয়ার উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই পাহাড়ের পাদদেশ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে। প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চললে অনেক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব হবে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী আবদুস সালাম ও মাহ আলম যুগান্তরকে বলেন, বর্ষা মৌসুম এলেই তাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাদের ভাষ্য, পাহাড় ধসে কখন ঘরবাড়ি চাপা পড়ে যাবে—এই শঙ্কা নিয়েই দিন-রাত কাটাতে হয়। অধিকাংশ ঘরই পাহাড় কেটে তৈরি করা ঢালের ওপর বাঁশ, ত্রিপল ও অস্থায়ী উপকরণ দিয়ে নির্মিত। ভারি বৃষ্টি হলেই মাটি নরম হয়ে যায় এবং সামান্য ভূমিধসও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার স্বজন হারিয়েছে, আবার অনেকের ঘরবাড়িও ধসে গেছে।

শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজার সদর, রামু ও উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ পাহাড়ের পাদদেশ ও ভূমিধসপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছেন। টানা বৃষ্টির কারণে এসব এলাকায়ও ভূমিধসের আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় মানুষের মধ্যে চরম উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ক্যাম্পের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় ও কিছু রোহিঙ্গার অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে বহু স্থানে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বারবার সতর্ক করা হলেও একটি অসাধু চক্র পাহাড় কাটা অব্যাহত রেখেছে, যার পরিণতিতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

তিনি আরও বলেন, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং এক ধরনের মানবসৃষ্ট হত্যাকাণ্ড। যারা অবৈধভাবে পাহাড় কেটে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

/এসএন