‘জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, আর কতদিন বলো সইবো’—সৈয়দ আব্দুল হাদীর জনপ্রিয় সেই গানের কথাগুলো যেন বাস্তব হয়ে উঠেছে বাগেরহাটের ১০ বছর বয়সী শিশু জুনায়েদ হোসেনের জীবনে। জন্মের পর থেকেই কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে বড় হওয়া এই শিশুটি এখন ক্যান্সারের সঙ্গে জীবন-মৃত্যুর লড়াই করছে। মরণব্যাধি ক্যান্সার ইতোমধ্যে কেড়ে নিয়েছে তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাট সদর উপজেলার বারুইপাড়া ইউনিয়নের সরদারপাড়া গ্রামের স্বপন সরদার ও হিরা বেগমের ছেলে জুনায়েদ। বর্তমানে সে স্থানীয় একটি মাদরাসার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী।
মাত্র দেড় বছর বয়সে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ হয় জুনায়েদের। এরপর তারা দুজনই নতুন সংসার গড়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে তারা আর সন্তানের কোনো খোঁজ নেননি। ছোট্ট জুনায়েদ বড় হয়েছে তার বৃদ্ধা নানি খাইরুল বেগমের স্নেহ-ভালোবাসায়।
কিছুদিন আগেও অন্য শিশুদের মতো পড়াশোনা, খেলাধুলা আর হাসি-আনন্দে দিন কাটছিল তার। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগে হঠাৎ চোখে তীব্র ব্যথা ও জ্বালাপোড়া শুরু হলে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানান, সে ক্যান্সারে আক্রান্ত। অল্প সময়ের মধ্যেই তার দুই চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়।
অভাব-অনটনের সংসারে ছাগল, হাঁস-মুরগি পালন করেই নাতিকে নিয়ে কোনোভাবে জীবনযাপন করেন খাইরুল বেগম। সেই সামান্য আয় দিয়েই এতদিন নাতির পড়াশোনা, ভরণপোষণ ও চিকিৎসার খরচ চালিয়ে এসেছেন। কিন্তু ক্যান্সারের চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে খাইরুল বেগম বলেন, ‘জন্মের পর থেকেই নাতিটার কপাল খারাপ। জুনায়েদকে আমার কাছে রেখে বাবা-মা আলাদা আলাদা সংসার পাতলো। এরপর আমি কোনোমতে ওকে নিয়ে বেঁচে আছি। কিন্তু এখন আমার নাতিটা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। আমি কীভাবে ওর চিকিৎসা করামু।’
তিনি আরও বলেন, ‘ওর চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার দরকার। এত টাকা জোগাড় করা আমার মতো অসহায় মানুষের পক্ষে সম্ভব না। সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের কাছে হাতজোড় করে আবেদন করছি—আপনারা আমার নাতিকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন। আপনাদের সামান্য সহযোগিতাই হয়তো ওর জীবনে আবার বাঁচার আশা ফিরিয়ে আনতে পারে।’
প্রতিবেশী সোহাগ মিয়া বলেন, জুনায়েদ অত্যন্ত শান্ত, ভদ্র ও মেধাবী। ছোটবেলা থেকেই সে নানির স্নেহে বড় হয়েছে। এখন ক্যান্সারের মতো কঠিন রোগের সঙ্গে লড়ছে। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষ এগিয়ে এলে হয়তো সে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর শেখ বলেন, জুনায়েদের চিকিৎসার জন্য সবার সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন। সমাজের হৃদয়বান ব্যক্তি, প্রবাসী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে শিশুটির চিকিৎসায় বড় সহায়তা হবে।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোসা. আতিয়া খাতুন বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। পরিবারের সদস্যরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিশুটির পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।