জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদকে হত্যায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়েছে। রোববার চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয় ৮০৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হাতে পেয়েছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বলেন, চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হস্তান্তর করা হয়েছে। রায় পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ওয়েবসাইটে এখনো রায়টি প্রকাশ করা হয়নি।
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ১২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন আবু সাঈদ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে চলা কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন তিনি। তাঁর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলন আরও তীব্র হয় এবং একপর্যায়ে তা সরকার পতনের আন্দোলনে রূপ নেয়। পরবর্তীতে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
গত বছরের ১৩ জানুয়ারি আবু সাঈদের পরিবারের সদস্যরা ২৫ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেন। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হয়। ২৪ জুন তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন জমা দিলে ৩০ জুন তা আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল। পলাতক আসামিদের পক্ষে ২২ জুলাই রাষ্ট্রীয় খরচে আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে গত বছরের ৬ আগস্ট ৩০ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২৭ আগস্ট প্রসিকিউশনের সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। মামলায় আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেনসহ ২৫ জন সাক্ষ্য দেন।
চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক শুরু হয়ে ২৫ জানুয়ারি শেষ হয়। পরে ৯ এপ্রিল বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
রায়ে দুই আসামিকে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি ২৫ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মামলায় মোট ৩০ জন আসামির মধ্যে রয়েছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মো. হাসিবুর রশীদ। রায় ঘোষণার সময় ২৪ জন আসামি পলাতক ছিলেন। গত ১৬ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের একটি বাসা থেকে গ্রেপ্তার হন হাসিবুর রশীদ। তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি হলেন পুলিশের সাবেক সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। তাঁরা বর্তমানে গ্রেপ্তার অবস্থায় রয়েছেন।
যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত তিন আসামি হলেন রংপুর মহানগর পুলিশের সাবেক সহকারী কমিশনার মো. আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল ইসলাম নয়ন এবং আরএমপির সাবেক উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) বিভূতি ভূষণ রায় মাধব। এ তিনজনই পলাতক।
এ ছাড়া হাসিবুর রশীদসহ পাঁচজনকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তাঁদের মধ্যে চারজন এখনো পলাতক। আরও নয়জনকে পাঁচ বছর এবং ১০ জনকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
বেরোবির প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ আপেলকে কয়েকটি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হলেও ট্রাইব্যুনাল রায়ে উল্লেখ করেছে, তাঁর হাজতবাসের সময়ই কারাদণ্ড হিসেবে গণ্য হবে। অন্য কোনো মামলা না থাকলে তাঁকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।