বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের এক নিখোঁজ নেতাকে উদ্ধার এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার বিষয় নিয়ে জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া এক বিবৃতিকে ঘিরে এ পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। পরে স্পিকারের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। একই সঙ্গে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার রুলিং দেওয়া হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
অধিবেশনে ৩০০ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ১১ জুন কুমিল্লা থেকে নিখোঁজ হওয়া বাংলাদেশ ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সহকারী আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ জিসান মিয়া প্রধানের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, পুলিশি অনুসন্ধানে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে এক নারীর সঙ্গে জিসানের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে একাধিকবার ধর্ষণের ফলে ওই নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। পরে জিসান তাকে জোরপূর্বক ভ্রূণ নষ্ট করার ওষুধ খাওয়ান বলে অভিযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ১২ জুন বিয়ের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও ১১ জুন রাতে বিয়ের আসরে না বসার উদ্দেশ্যে জিসান নিজেই আত্মগোপন করেন। পরে পুলিশ তাকে লাকসাম এলাকা থেকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে জিসানসহ চারজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। মামলায় ইতোমধ্যে দুজন আসামি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ ঘটনায় অনেকেই তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে নিখোঁজের বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে সরকারকে দায়ী করার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা থেকেই তিনি বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেছেন বলে উল্লেখ করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য শেষ হওয়ার পরই ফ্লোর নিয়ে আপত্তি তোলেন বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাহের। তিনি বলেন, ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার পর সম্পূরক প্রশ্ন করার সুযোগ না থাকলেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সেই সুযোগ ব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক দলকে ঘিরে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য দিয়েছেন।
সৈয়দ মোহাম্মদ আবদুল্লাহ তাহের বলেন, একটি অনিষ্পন্ন ও বিতর্কিত বিষয়কে এভাবে সংসদে উপস্থাপন করা বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম। তার দাবি, মনে হচ্ছে একটি দলকে নিন্দা করার উদ্দেশ্যেই বিষয়টি ইচ্ছাকৃতভাবে সংসদে আনা হয়েছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, জিসান বর্তমানে কোথায় আছেন, কুমিল্লার পুলিশ কেন জিসান বা অভিযোগকারী নারীর সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা বলতে দিচ্ছে না এবং এ ঘটনার পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না।
বিরোধীদলীয় উপনেতার বক্তব্যের পরপরই সরকারি দল ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের সদস্যরা দাঁড়িয়ে চিৎকার ও হট্টগোল করতে থাকেন। এতে সংসদ কক্ষে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার বারবার সংসদ সদস্যদের নিজ নিজ আসনে বসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ৩০০ বিধিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পর কোনো প্রশ্ন বা বিতর্কের সুযোগ নেই। তবে বিরোধীদলীয় উপনেতা দাঁড়ানোয় তাকে বিশেষ বিবেচনায় বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই স্পিকার রুলিং দিয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে যদি সংসদীয় রীতিনীতির বাইরে বা অসংসদীয় কোনো শব্দ বা বক্তব্য থেকে থাকে, তাহলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে পরবর্তীতে এক্সপাঞ্জ বা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
স্পিকারের এ রুলিং এবং কঠোর অবস্থানের পর সংসদ কক্ষের পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় উপনেতাসহ অন্যান্য সদস্য নিজ নিজ আসনে বসলে স্পিকার পরবর্তী কার্যসূচি অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরুর ঘোষণা দেন।
/এসএন