• ঢাকা
  • শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:০৩ এএম


জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৮:২০ এএম

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলায় ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের তৃতীয় দিনের বিকেলের পর্বে ১৮ জন বক্তার মধ্যে তিনি ১১তম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন।

বাংলায় দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের দৃষ্টিভঙ্গি ও বিভিন্ন অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। তার বক্তব্যে জলবায়ু পরিবর্তন, বিশ্ব শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, মানবিক বিষয় এবং রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পায়।

নিচে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া ভাষণের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য তুলে ধরা হলো—

মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।

সভাপতি হিসেবে আপনার দায়িত্ব পালনের সময়ে আপনাকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দিচ্ছি। একই সঙ্গে বিদায়ী সভাপতি ম্যাডাম এনালেনা বেয়ারবককে তার যোগ্য নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

শুরুতেই বাংলাদেশের সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। স্বাধীনতার পর থেকে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা আত্মত্যাগ করেছেন, তাদের অবদান বিনম্রচিত্তে স্মরণ করছি। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বীর ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে নিহত সব শহীদ ও আহতদের প্রতিও জানাই অকৃত্রিম শ্রদ্ধা।

ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময়ের আন্দোলন-সংগ্রামের পথ পেরিয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে ফ্যাসিবাদমুক্ত। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনে জনগণ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দেশের গণতন্ত্রকামী জনগণকে অভিনন্দন জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, জনগণই আমাদের সব রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।

মাননীয় সভাপতি, জাতিসংঘের এই বিশ্বমঞ্চে দাঁড়িয়ে আজ আমি কিছুটা স্মৃতিকাতর। এই বিশ্বমঞ্চেই আমার পিতা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আমার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের পক্ষে ভাষণ দিয়েছিলেন। একইভাবে আজ আমিও আমার দেশ ও জনগণের স্বার্থে এবং একটি শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় এখানে দাঁড়িয়েছি।

বিশ্বায়নের এই সময়ে বিশ্বের কোনো প্রান্তে যা-ই ঘটুক, তার কমবেশি নেতিবাচক প্রভাব প্রতিটি রাষ্ট্রেই পড়ে। মানবসৃষ্ট বিভিন্ন সংঘাতের কারণে বর্তমানে অনেক দেশে অশান্ত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হচ্ছে এবং তৈরি হচ্ছে মানবিক সংকট। যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির কারণে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।

আমরা মনে করি, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থরক্ষা এবং সম্মান ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাই দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া প্রয়োজন।

আমাদের প্রত্যাশা একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্বসমাজ—যেখানে মারণাস্ত্র নয়, বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে। একে অপরের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল একটি সমঝোতামূলক বিশ্বসমাজ প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে দেখতে চায়।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের বাজেট সামরিক খাতে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা বিশ্বশান্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ তাদের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ আবারও তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।

মাননীয় সভাপতি, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All’ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী।

আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতার নীতিতে অটল। ‘পিসবিল্ডিং কমিশন’-এর ভাইস-চেয়ার হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তি প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।

প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নারীদের সাহসী অংশগ্রহণ ‘নারীর অগ্রযাত্রা, শান্তি ও নিরাপত্তা’ বিষয়ক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

বাংলাদেশ এ বছর ‘উন্নয়নের অধিকার বিষয়ক ঘোষণা’র ৪০তম এবং ‘ডারবান ঘোষণা ও কর্মপরিকল্পনা’র ২৫তম বার্ষিকী পালন করছে। অভিবাসন প্রক্রিয়া মানবসভ্যতার মতোই প্রাচীন। বিশ্বের অনেক দেশে অভিবাসীরা তাদের জন্মভূমি ও যে দেশে তারা অভিবাসিত হয়েছেন—উভয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

বাংলাদেশ সরকার নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও জোরালো বৈশ্বিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করে।

মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশকে দীর্ঘ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিতে হচ্ছে। এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

জনবহুল বাংলাদেশ মনে করে, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াই এই সমস্যার একমাত্র সমাধান।

এই সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন প্রত্যাশা করে। পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের জীবন রক্ষাকারী সহায়তা কর্মসূচি অব্যাহত রাখার জন্য জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে অদূর ভবিষ্যতে এটি একটি মানবিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

মাননীয় সভাপতি, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের তেমন ভূমিকা না থাকলেও দেশটিকে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব বহন করতে হচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ঝুঁকি মোকাবিলা করে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জনের পথ বেছে নিয়েছে। তাই ক্লাইমেট জাস্টিস, জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ COP-31 এ আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রত্যাশা করে।

বাংলাদেশে পরিবেশ সুরক্ষায় সরকার কর্মসূচি জোরদার করেছে। এর অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। ক্লিন এনার্জি ও সোলার এনার্জি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশকে বন্যা ও খরার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিও শুরু করা হয়েছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনে মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানো এবং বৃহৎ জলাধারের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের জন্য তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজও শুরু হয়েছে।

একই সঙ্গে পানি সংরক্ষণ ও দূষণ রোধে অভ্যন্তরীণ পদক্ষেপ জোরদার করার পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে সরকার ১৯৯২ সালের ‘ওয়াটার কনভেনশন’ স্বাক্ষর করেছে।

মাননীয় সভাপতি, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হওয়া গুম-খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও টাকা পাচারের অভিশাপ থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ বর্তমানে আবারও গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করছে।

ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশকে মেরামতের জন্য সরকার Recovery, Restoration এবং Reconstruction—অর্থাৎ 3-R কৌশল অনুসরণ করছে।

বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্য সরকার ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এই কর্মযজ্ঞে বাংলাদেশ তার উন্নয়ন সহযোগীদের পাশে পেতে চায়।

দেশের তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের জন্য স্টার্টআপ উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি করতে সরকার চলতি অর্থবছরে ৪ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রেখেছে।

মাননীয় সভাপতি, দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি নারী। তাই দেশের আর্থসামাজিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে নারীরা সরকারের সব পরিকল্পনার অগ্রভাগে রয়েছেন। নারী শিক্ষা, নারীদের কর্মসংস্থান এবং নারী উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়কে সরকার অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তা তৈরির জন্য সরকার নারীদের নগদ অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারিত করেছে। স্নাতক শ্রেণি পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে শিক্ষার সুযোগও অবারিত করা হয়েছে।

শুধু ভোটের গণতন্ত্র নয়, সরকার অর্থনীতির গণতন্ত্রায়নও নিশ্চিত করতে চায়, যাতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সমৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।

এই লক্ষ্য পূরণে ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং ই-হেলথ কার্ডের মতো বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

প্রতিটি পরিবারের নারী প্রধানের নামে ইস্যু করা ‘ফ্যামিলি কার্ড’-কে সরকার নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। প্রতিটি খাতে সহায়তার জন্য প্রবর্তন করা কার্ডগুলোকে সমন্বিত করে একটি ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালু করাও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে।

মাননীয় সভাপতি, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে দেওয়া ৩১ দফা কর্মসূচি সরকার বাস্তবায়ন করে চলেছে। জাতিসংঘ ঘোষিত এসডিজির ‘Leave No One Behind’ প্রতিপাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সরকারের ৩১ দফা কর্মসূচির কমপক্ষে ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশ কার্যক্রমের পরোক্ষভাবে মিল রয়েছে।

সরকার আশা করে, এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে শহর ও গ্রামের মধ্যে উন্নয়ন বৈষম্য দূর হবে। একই সঙ্গে ২০৩০ এজেন্ডার সব ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।

বাংলাদেশ সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও স্পোর্টসকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। দেশের ইতিহাসে এসব খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নৈতিক মানসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষা কারিকুলাম প্রণয়ন করা হয়েছে।

প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাগ ও পোশাক অর্থাৎ স্কুল ইউনিফর্ম এবং বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়া হচ্ছে। সরকার আশা করে, এর ফলে স্কুলে শিক্ষার্থীর হার ও শিক্ষার মান বাড়বে।

খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রথমবারের মতো শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’-কেও একটি বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে গত জুন মাসে স্কুল শিক্ষার্থীদের নিয়ে সারাদেশে মাসব্যাপী আয়োজিত একটি ফুটবল টুর্নামেন্টে ২ মিলিয়নের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।

মাননীয় সভাপতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আগামী বিশ্বের ভবিষ্যৎ গড়ে দেবে। আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, বায়োটেকনোলজি এবং বিজ্ঞানের এক নতুন যুগে প্রবেশ করছি। প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে চললেও এর সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়।

বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ জনগোষ্ঠী এবং ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতা নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনতে হবে।

আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক। বাংলাদেশ উদ্ভাবন ও মেধাস্বত্বকে সম্মান করে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় কোনো দেশ যেন পিছিয়ে না থাকে। সবার জন্য ন্যায্য ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়তে বাংলাদেশ একসঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও সোশ্যাল মিডিয়ার বিকাশ এবং দ্রুত সম্প্রসারণের সুফল যাতে দেশে দেশে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো যায়, এ বিষয়ে জাতিসংঘের একটি কার্যকর নীতিমালা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

মাননীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ‘স্বল্পোন্নত দেশ’-এর তালিকা থেকে উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে। বাংলাদেশের পাশাপাশি অন্যান্য সব দেশের ক্ষেত্রেও এই উত্তরণ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে অধিকতর প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলোতে ধারাবাহিক সহায়তা অপরিহার্য।

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় প্রতিটি দেশ একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশ মনে করে, বিশেষ করে আঞ্চলিক পর্যায়ে বাণিজ্য সহায়তা ও সম্প্রসারণ, কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং অর্থবহ সহযোগিতার মাধ্যমে আমরা একে অপরের সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করতে পারি।

কোভিড মহামারি বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। তবে এই মহামারি বিশ্বকে একটি বার্তা দিয়েছে—বিশ্বসমাজকে টিকে থাকতে হলে একের প্রতি অন্যের সহায়তা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য।

উন্নয়নশীল দেশগুলোতে টিকা, চিকিৎসাসামগ্রী এবং রোগ নির্ণয়ের সরঞ্জামের টেকসই উৎপাদন নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে এগুলো সবার জন্য সহজলভ্য হয়।

মাননীয় সভাপতি, রাষ্ট্রের নাগরিকদের ক্ষমতাহীন রেখে কোনো রাষ্ট্র কখনো শক্তিশালী হতে পারে না। জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার মাধ্যমে আমরা এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই নিশ্চিন্তে, নিরাপদে সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে বসবাস করতে সক্ষম হবে।

মাননীয় সভাপতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকার ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব, নিরাপদ ও স্থিতিশীল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছে।

বর্তমান গণতান্ত্রিক বাংলাদেশে আমরা অংশীদারিত্ব, উদ্ভাবন এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে তরুণরা নির্ভয়ে ও নির্বিঘ্নে তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ খুঁজে পাবে, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারবে, প্রতিটি শিশু তাদের সব সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিয়ে বেড়ে উঠবে এবং সর্বোপরি জনগণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে।

এজন্যই আমরা বলি, ‘সবার আগে বাংলাদেশ – সবার জন্য বাংলাদেশ’।

বিশ্ব মানবতার প্রতি পুনরায় বাংলাদেশের অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে আমার বক্তব্য শেষ করছি।

মাননীয় সভাপতি, আপনাকে ধন্যবাদ। বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।

/এসএন