ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ মাসগুলোর অন্যতম হলো জিলহজ। এ মাসেই পালিত হয় ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হজ। বিশেষ করে জিলহজের প্রথম ১০ দিনের রয়েছে আলাদা মর্যাদা ও ফজিলত। পবিত্র কোরআনেও এই দশকের রাতগুলোর শপথ করেছেন আল্লাহ তাআলা।
পবিত্র কোরআনে এসেছে, ‘শপথ প্রত্যুষের এবং দশ রাতের।’ (সূরা ফাজর, আয়াত: ১-২)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদের চতুষ্পদ জন্তু থেকে যা রিজিক হিসেবে দান করেছেন, তার ওপর নির্দিষ্ট দিনগুলোয় আল্লাহর নাম স্মরণ করতে পারে।’ (সূরা হজ, আয়াত: ২৮)
তাফসিরবিদদের মতে, এখানে ‘দশ রাত’ ও ‘নির্দিষ্ট দিনগুলো’ দ্বারা জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনকে বোঝানো হয়েছে।
হাদিসেও এই দিনগুলোর বিশেষ মর্যাদার কথা উল্লেখ রয়েছে। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমন কোনো দিন নেই যার আমল জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিনের আমল থেকে আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় হবে।’
সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদ করাও কি এর চেয়ে উত্তম নয়?’
উত্তরে রাসূল (সা.) বলেন, ‘হ্যাঁ, তবে এমন ব্যক্তি ছাড়া, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হলো এবং কিছুই ফিরে নিয়ে এলো না।’ (বুখারি ও তিরমিজি)
হাদিসের আলোকে জিলহজের প্রথম ১০ দিনে যেসব আমলের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
এই দিনগুলোতে বেশি পরিমাণে নেক আমল করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। নফল নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, নফল রোজাসহ সব ধরনের উত্তম কাজ আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়।
জিলহজ গুনাহ মাফের মাস হিসেবেও পরিচিত। তাই অতীতের ভুলের জন্য আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। অতঃপর তাঁর কাছেই ফিরে এসো। নিশ্চয়ই তোমার রব অতি দয়ালু ও অধিক মমতাময়।’ (সুরা হুদ: ৯০)
এই সময় ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ ও ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বেশি বেশি পাঠ করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এই দিনগুলোতে বেশি বেশি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্লাহু আকবার” ও “আলহামদুলিল্লাহ” পড়।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৫৪৪৬)
জিলহজের চাঁদ ওঠার পর কোরবানি সম্পন্ন করা পর্যন্ত নখ, চুল ও শরীরের পশম না কাটা মুস্তাহাব। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যখন তোমরা জিলহজের চাঁদ দেখতে পাও এবং তোমাদের কেউ কোরবানি করতে চায়, সে যেন তার চুল ও নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৯৭৭)
সম্ভব হলে জিলহজের প্রথম থেকে নবম দিন পর্যন্ত রোজা রাখা উত্তম। বিশেষ করে আরাফার দিনের রোজার ফজিলত অত্যন্ত বেশি। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আরাফার দিনের রোজার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এক বছর আগের ও এক বছর পরের গুনাহ ক্ষমা করে দেন।’ (মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
হজ ইসলামের ফরজ বিধান। সামর্থ্যবান মুসলমানের জীবনে একবার হজ করা ফরজ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাবরুর হজের প্রতিদান জান্নাত ছাড়া আর কিছুই নয়।’ (সহিহ বুখারি: ১৭৭৩)
৯ জিলহজ বা আরাফার দিনটি অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এ দিনে বেশি বেশি দোয়া, জিকির ও ইবাদতে মশগুল থাকা উচিত।
জিলহজের ৯ তারিখ ফজর থেকে ১৩ তারিখ আসর পর্যন্ত প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর তাকবিরে তাশরিক পড়া ওয়াজিব।
তাকবিরটি হলো—
الله أكبر، الله أكبر، لا إله إلا الله، و الله أكبر، الله أكبر، و لله الحمد
উচ্চারণ: ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার; ওয়া লিল্লাহিল হামদ।’
এই দিনগুলোতে গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল গুনাহ ছেড়ে দাও।’ (সুরা আনআম: ১২০)
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না করা সম্পর্কে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে হাদিসে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যার কোরবানি করার সামর্থ্য আছে কিন্তু কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস: ৭৬৩৯)
দোয়া ইবাদতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে রোজাদারের ইফতারের আগের সময় দোয়া কবুলের বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে বিবেচিত।
ইসলামে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানির গোশতের একটি অংশ আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করাও মুস্তাহাব। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।’ (সহিহ বুখারি: ৫৯৮৪)
/এসএন