• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৩০ পিএম


ক্যানসার-কিডনি জটিলতার শঙ্কা

বাজারে বিষমাখা আম-লিচুর ছড়াছড়ি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১০ মে ২০২৬ ৩:৪৫ পিএম

মৌসুম শুরুর আগেই বাজারে আগাম আম ও লিচুর দখল নিয়েছে কেমিক্যাল সিন্ডিকেট। বেশি মুনাফার আশায় অপরিপক্ব ফল কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন ধরনের হরমোন ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। বাইরে থেকে টকটকে হলুদ কিংবা লাল দেখালেও ঘরে নেওয়ার পর অনেক ফলের ভেতরে মিলছে কাঁচা ও স্বাদহীন অবস্থা। অথচ এসব ফলই স্বাভাবিকের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

প্রকাশ্যে এমন কারসাজি চললেও কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। ফলে একদিকে যেমন প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ ক্রেতারা, অন্যদিকে নীরবে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে মানুষকে।

গত ২৯ এপ্রিল সাতক্ষীরা থেকে চট্টগ্রামগামী একটি ট্রাক থেকে প্রায় ৯ হাজার কেজি কেমিক্যাল ও কার্বাইড দিয়ে পাকানো অপরিপক্ব আম জব্দ করে পুলিশ। সাতক্ষীরা সদর থানা পুলিশ জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাত ২টার দিকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থেকে আসা একটি ট্রাক তল্লাশি করা হয়। এ সময় ৩৫১ ক্যারেট আম জব্দ করা হয়, যার মোট ওজন প্রায় ৯ হাজার কেজি। পুলিশের দাবি, এসব আম অপরিপক্ব অবস্থায় কেমিক্যাল ব্যবহার করে পাকানো হয়েছিল।

শনিবারও রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লার দোকানে এসব আগাম ফল বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাজারে গোবিন্দভোগ, গোলাপখাস, গুটি, কাটিমন ও বৃন্দাবনীসহ বিভিন্ন জাতের আম বিক্রি হচ্ছে। জাত ও আকারভেদে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি আমের দাম রাখা হচ্ছে ১৯০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ রাজধানীর পাইকারি বাজার বাদামতলীতে একই আম কেজিপ্রতি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

একইভাবে লিচুর বাজারেও উচ্চমূল্য দেখা গেছে। খুচরা বাজার ও পাড়া-মহল্লার ফলের দোকানগুলোতে প্রতি ১০০টি লিচুর ছড়া ৪৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৯০০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে।

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত মো. আমিনুল ইসলাম জানান, গত বুধবার অফিস শেষে নয়াপল্টন থেকে বাসায় ফেরার পথে লালচে রঙের টসটসে আম দেখে তিনি কিনেছিলেন। সন্তানদের জন্য নেওয়া সেই আম বাসায় সবাই পছন্দও করে। কিন্তু আম কাটার পর দেখা যায় বাইরে পাকা হলেও ভেতরে কাঁচা। তারপরও বছরের প্রথম আম ভেবে সবাই খেয়ে নেন।

তিনি বলেন, “রাতের মধ্যেই সমস্যা শুরু হয়। হঠাৎ বাচ্চা কান্না করে ঘুম থেকে উঠে বলে পেটে ব্যথা করছে। পরে পুরো পরিবারই ভোগান্তিতে পড়ে। কী এক ভয়ংকর রাত গেছে।”

শনিবার নয়াবাজারে আম ও লিচু কিনতে আসা মো. সালাউদ্দিন বলেন, “এখন আম কিনলে ভালো হবে না—এটা ধরেই নিচ্ছি। তবুও লোভ সামলাতে পারিনি। আম কিনেছি ২৫০ টাকা কেজি দরে। আর লিচুর দাম চাইছে ৮০০ টাকা। বিক্রেতারা আগাম ফল এনে অতি মুনাফা করছে, কিন্তু কেউ কিছু বলছে না।”

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, অপরিপক্ব আম ও লিচু পাকাতে অনেক সময় ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথোফেন ও বিভিন্ন রাইপেনিং হরমোন ব্যবহার করা হয়, যা মানবদেহের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কার্বাইড মূলত শিল্পক্ষেত্রে ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক। এটি ফলের আর্দ্রতার সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাসযুক্ত ফল খেলে পেটের ভেতরে প্রদাহ, তীব্র পেটব্যথা, বমি, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া ও পেট জ্বালাপোড়ার মতো সমস্যা হতে পারে।

তিনি আরও জানান, অ্যাসিটিলিন গ্যাসের প্রভাবে মস্তিষ্কে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মানসিক বিভ্রান্তি এমনকি খিঁচুনির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। এছাড়া রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যেতে পারে।

ডা. শামীম আহমেদের মতে, অপরিপক্ব লিচুতে থাকা মিথাইলিন সাইক্লোপ্রোপাইলগ্লাইসিন নামক প্রাকৃতিক উপাদান খালি পেটে খেলে শিশুদের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ কমে যেতে পারে, যা এনসেফালোপ্যাথির মতো মারাত্মক রোগ সৃষ্টি করতে পারে।

তিনি বলেন, কার্বাইডে আর্সেনিক ও ফসফরাসের মতো বিষাক্ত উপাদানের উপস্থিতি থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। নিয়মিত এমন কেমিক্যালযুক্ত ফল খেলে লিভার ও কিডনির কার্যকারিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, কার্বাইডে পাকানো ফল খেলে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে এবং পুরুষদের উর্বরতা কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। দীর্ঘদিন এসব কেমিক্যালের সংস্পর্শে থাকলে শ্বাসকষ্ট, দীর্ঘস্থায়ী ব্রঙ্কাইটিস ও স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, ফল কেনার পর খাওয়ার আগে অন্তত এক থেকে দুই ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখা উচিত। পাশাপাশি বেকিং সোডা বা হালকা গরম পানিতে ধুয়ে নিলে কিছুটা কেমিক্যালের প্রভাব কমতে পারে।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, ফলের মৌসুম শুরুর এক-দুই মাস আগেই অসাধু কেমিক্যাল সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে। তারা কাঁচা ফল বিষাক্ত কেমিক্যাল ব্যবহার করে পাকা দেখিয়ে বেশি দামে বিক্রি করে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে এমন কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং বহু ফল ধ্বংসও করা হয়েছে। তাই ভোক্তাদের সচেতন হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থাগুলোকে কঠোর নজরদারি করতে হবে।

জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, খাবারে বিষ বা কেমিক্যাল ব্যবহারের বিষয়টি অন্য সংস্থা দেখভাল করে। তবে তাদের পক্ষ থেকে বাজার তদারকি কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে ফলের বাজারে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং অনিয়ম পেলে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে।

/এসএন