বাংলাদেশে গত এক দশকে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে, যা এটিকে একটি বড় জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত করেছে। ২০১৫ সালে বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করার পর থেকে সরকারি তথ্য অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ৩ হাজার ৬৫৮ জন প্রাণ হারিয়েছেন। একসময় মৃত্যুর সংখ্যা বাড়লেও ২০২০ সালের পর থেকে তা ধীরে ধীরে কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যার পেছনে আগাম সতর্কতা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন আবহাওয়াবিদরা।
বজ্রপাতের দিক থেকে দেশের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হলো সিলেট ও এর আশপাশের এলাকা। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ, রাজশাহী, যশোর, কুষ্টিয়াসহ আরও বেশ কিছু জেলায় তুলনামূলক বেশি বজ্রপাত হয়। মূলত হাওড় এলাকার জলীয় বাষ্প, পাহাড়ি বাধা এবং বিভিন্ন বায়ুপ্রবাহের সংঘর্ষের কারণে এসব অঞ্চলে বজ্রপাত বেশি ঘটে।
বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি দেখা যায়। মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসে প্রায় ৩৮ শতাংশ বজ্রঝড় হয়, আর বর্ষাকালে (জুন-সেপ্টেম্বর) হয় ৫১ শতাংশ। তবে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে বৈশাখ মাসের কালবৈশাখী ঝড়ে, যা তুলনামূলক বেশি শক্তিশালী ও ধ্বংসাত্মক। এই সময় আকাশে কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়ে বজ্রপাত, ঝড়ো হাওয়া, শিলাবৃষ্টি ও ভারী বৃষ্টির সৃষ্টি করে।
বজ্রপাতের সময় ঊর্ধ্বাকাশে প্রায় ২৭ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সৃষ্টি হয়, যা সূর্যের তাপমাত্রার চেয়েও অনেক বেশি। এই তীব্র শক্তির কারণে বজ্রপাতের সঙ্গে বজ্রধ্বনি তৈরি হয়। যদিও আলো আগে দেখা যায় এবং শব্দ পরে শোনা যায়, কারণ আলোর গতি শব্দের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হলো খোলা জায়গায় মানুষের উপস্থিতি। বিশেষ করে কৃষক, জেলে ও মাঠে কাজ করা মানুষ ঝুঁকিতে থাকেন। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব ও সচেতনতার ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বজ্রপাত থেকে বাঁচতে হলে কিছু সতর্কতা মেনে চলা জরুরি। ঝড়ের সময় ঘরের ভেতরে থাকা সবচেয়ে নিরাপদ। খোলা মাঠ, জলাশয় বা গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক। বাইরে থাকলে নিচু হয়ে বসে থাকা, ধাতব বস্তু ও বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে দূরে থাকা উচিত। নৌকায় থাকলে ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং গাড়ির ভেতরে থাকলে ধাতব অংশ স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বজ্রপাতের ভৌগোলিক বিস্তৃতি কমেনি, তবে সচেতনতা ও আগাম সতর্কতার কারণে প্রাণহানি কিছুটা কমছে। তবুও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।