চারদিকে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। কোথাও বিধ্বস্ত বাড়িঘর, আবার কোথাও বাস্তুচ্যুত মানুষের সারি সারি তাঁবু। এমন অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগের মধ্যেও ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় তৈরি হয়েছে আনন্দের এক বিশেষ উপলক্ষ। ধ্বংসস্তূপের মাঝেই নতুন জীবন শুরুর প্রত্যাশায় একসঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন ২৫০ ফিলিস্তিনি যুগল।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) গাজায় ব্যতিক্রমী এই গণবিয়ের আয়োজন করা হয়। শনিবার (৭ নভেম্বর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে যুদ্ধবিধ্বস্ত জনপদে আয়োজিত এই আনন্দঘন অনুষ্ঠানের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
বিয়ের অনুষ্ঠান উপলক্ষে সাজানো হয়েছিল গাড়ির বহর। ফিলিস্তিনের জাতীয় পতাকা, রঙিন ফুল ও লাল ফিতা দিয়ে সুসজ্জিত গাড়িগুলো নিয়ে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। গাজার ক্ষতবিক্ষত সড়ক পেরিয়ে শোভাযাত্রাটি পৌঁছায় ভূমধ্যসাগরের তীরবর্তী সি ক্লাবে। সেখানেই আয়োজন করা হয় গণবিয়ের মূল অনুষ্ঠান।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের উদ্যোগ ‘অপারেশন নাইটলি নাইট-৩’-এর আওতায় এই গণবিয়ের আয়োজন করা হয়। এতে সহযোগিতা করে সাকর বিন মোহাম্মদ আল কাসিমি চ্যারিটেবল অ্যান্ড হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন।
দীর্ঘদিনের সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গাজার অনেক তরুণ-তরুণীর বিয়ের স্বপ্ন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। জীবনধারণের ন্যূনতম ব্যয় মেটাতেই যেখানে মানুষকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেখানে বিয়ের মতো আয়োজন করা অনেকের পক্ষেই প্রায় অসম্ভব। এমন বাস্তবতায় আর্থিক সংকটে থাকা তরুণ যুগলদের সহায়তা করতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে উৎসবের আনন্দের মধ্যেও অনেকের মধ্যে যুদ্ধের ক্ষত ও ঘর হারানোর বেদনা স্পষ্ট ছিল। গণবিয়েতে অংশ নেওয়া বর সাঈদ আল-নাজ্জারের জীবনেও জড়িয়ে আছে বাস্তুচ্যুত হওয়ার কষ্ট।
সাঈদ জানান, ইসরায়েলি হামলায় তাঁদের পারিবারিক বাড়িটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। বর্তমানে জাবালিয়া শরণার্থীশিবিরের ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন তিনি। নিজের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এমনকি স্থায়ীভাবে মাথা গোঁজার মতো কোনো ঠিকানাও তাঁর নেই।
আয়োজক কমিটির লটারির মাধ্যমে এই গণবিয়েতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান সাঈদ। জীবনের বিশেষ এই দিনটিকে তিনি কেবল নিজের ব্যক্তিগত আনন্দ হিসেবে দেখছেন না; বরং গাজার সব মানুষের আনন্দের অংশ বলে মনে করছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সাঈদ আল-নাজ্জার বলেন, ‘এই আনন্দ শুধু একজন বর কিংবা ২৫০ জন বরের নয়, এটি গাজার সব মানুষের আনন্দ।’
তিনি আরও জানান, গাজার হাজার হাজার মানুষের মতো তিনিও নিজের বাড়ি হারিয়েছেন। এখন তাঁর যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই।
যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ, ঘরহারা মানুষের কষ্ট এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও ২৫০ যুগলের এই গণবিয়ে আশার প্রতীক হয়ে উঠেছে। চারপাশে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে থাকলেও নতুন করে সংসার গড়ার স্বপ্ন যে এখনো বেঁচে আছে, গাজার এই আয়োজন যেন সেই বার্তাই তুলে ধরেছে।
/এসএন