• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১২:৩৯ এএম


ইরানে কূটনৈতিক তৎপরতার জোয়ার: যু/দ্ধ এড়াতে একজোট মুসলিম পরাশক্তিগুলো

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৭ অক্টোবর ২০২৬ ১১:০২ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়ানোর লক্ষ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করেছেন সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের জ্যেষ্ঠ প্রতিনিধিরা। সোমবার অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার এবং পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নে ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন চার দেশের প্রতিনিধিরা।ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘মক্কা অ্যালায়েন্স’-এর সদস্য দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের বৈঠকটি ফলপ্রসূ হয়েছে। এতে অংশগ্রহণকারী পক্ষগুলো চার দেশের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করেছে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের উপসচিব আলী বাঘেরি কানির বক্তব্য উদ্ধৃত করে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভি জানিয়েছে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সুসংহত করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়।মধ্যপ্রাচ্যকে বড় ধরনের অস্থিতিশীলতা থেকে রক্ষা করতে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যস্থতামূলক কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা করছেন মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতিনির্ধারকেরা। অন্যদিকে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়েছে। দুই পক্ষই বিমানবন্দর, তেলক্ষেত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করে প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।চলতি বছর সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান ‘মক্কা প্যাক্ট’ নামে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে। সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে নতুন করে সংঘাত বাড়ার পর ইরানের সঙ্গে এই তিন দেশের এটিই প্রথম উচ্চপর্যায়ের যৌথ বৈঠক। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বৈঠকে দেশটির পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান। ইরানি সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে, বৈঠকে অংশ নিতে তেহরানে যান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইব্রাহিম কালিন।সোমবার বিকেলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানায়, সফররত প্রতিনিধিদলটি দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মহসেন রেজাইয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছে। এর এক দিন আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতা করে সম্ভাব্য আঞ্চলিক যুদ্ধ ঠেকানোর প্রচেষ্টায় কাতারের একটি প্রতিনিধিদল তেহরান সফর করে বলে জানান ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই। এ ছাড়া, কূটনৈতিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে গত সপ্তাহেও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির তেহরান সফর করেছিলেন।চলমান আলোচনা সম্পর্কে অবগত পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সোমবারের বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য কাতার ও পাকিস্তানের চলমান মধ্যস্থতার উদ্যোগকে সমর্থন দেওয়া। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছাতে ইরানকে প্রয়োজনীয় নমনীয়তা দেখানোর জন্যও চাপ দেওয়া হচ্ছে।বৈঠক সম্পর্কে অবগত দুই কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, কাতার এমন একটি সমঝোতা নিয়ে কাজ করছে, যার আওতায় পাঁচ দিনের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান পরস্পরকে নির্দিষ্ট কিছু ছাড় দেবে। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী, ইরান বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেবে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ তুলে নেবে। ওই অবরোধ দেশটির অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।তবে সমঝোতার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে—কোন পক্ষ আগে ছাড় দেবে, তা নির্ধারণের বিষয়টি। মধ্যস্থতাকারীরা চাইছেন, চুক্তির প্রাথমিক পর্যায়েই ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বড় ধরনের ছাড় দিক।কিন্তু সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত কমানোর প্রস্তাব শুরুতেই প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। গত সপ্তাহে মহসেন রেজাই কঠোর অবস্থান জানিয়ে বলেন, ‘সমৃদ্ধ পারমাণবিক পদার্থের একটি একক কণাও ইরানের বাইরে যাবে না।’ইতিমধ্যে সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ইরানি কর্মকর্তাদের কেউ কেউ। একই সঙ্গে তাঁরা সতর্ক করে বলেছেন, ইরান আবার হামলার শিকার হলে দেশটির সশস্ত্র বাহিনী পাল্টা জবাব হিসেবে আঞ্চলিক ডেটা সেন্টার এবং সমুদ্রের তলদেশে থাকা সাবমেরিন ইন্টারনেট কেবলকেও লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।ইয়েমেনের হুথিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরব যখন নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখে, তখন দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের তেহরান সফর দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনার মধ্যেও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সৌদি যুবরাজের ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন প্রতিনিধি প্রিন্স খালিদকে তেহরানে পাঠানোর মধ্য দিয়ে বোঝা যাচ্ছে, সৌদি নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে আরেকটি বড় ধরনের সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক উদ্যোগে গুরুত্ব দিচ্ছে।এ ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সৌদি আরব একদিকে হুথিদের হামলা, অন্যদিকে ইরানের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে আঞ্চলিক সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো রিয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।অন্যদিকে, আঞ্চলিক কূটনীতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে ইরান এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা-সহায়তার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে না পেরে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ গত আগস্টে ‘মক্কা প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।বিশেষ করে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরু হওয়ার পর পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে। এরপর থেকেই নিজেদের মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে আলোচনা জোরদার হয়।সোমবার তেহরানে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, আঞ্চলিক দেশগুলো তাদের নিজস্ব স্বার্থ ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার যে উদ্যোগ বা আলোচনা শুরু করেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় একটি পদক্ষেপ।’

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস।

/বিএসএস