আজারবাইজানে হিজাব নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে রাস্তায় স্কুলশিক্ষার্থীরাআজারবাইজানে স্কুলের পোশাকবিধি সংশোধনের পর হিজাব পরা ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। হিজাব পরা ছাত্রীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে কয়েক দিন ধরে ক্লাস বর্জন করে স্কুলের ফটকে অবস্থান করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গত ১২ অক্টোবর রাজধানী বাকুতে বিক্ষোভ চলাকালে অন্তত ৩৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সরকারপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায় ২০০ জনকে আটকের খবর দিলেও সরকারিভাবে তা নিশ্চিত করা হয়নি।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আজারবাইজানে এটিকে সবচেয়ে বড় জনবিক্ষোভ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।পোশাকবিধি সংশোধনের পর বিতর্কগত ২১ সেপ্টেম্বর আজারবাইজানের মন্ত্রিপরিষদ স্কুলের পোশাকবিধিতে সংশোধনী আনে। এতে নির্ধারিত পোশাকবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কিংবা সাধারণ শিক্ষার ‘ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির’ সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ পোশাক নিষিদ্ধ করা হয়। তবে সংশোধিত আদেশে সরাসরি ‘হিজাব’ শব্দটির উল্লেখ ছিল না।কিন্তু গত ৯ অক্টোবর থেকে বিভিন্ন স্কুলে পরীক্ষা ও পরিদর্শন শুরু হলে মাথা ঢাকা ছাত্রীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিক্ষিকাদের মাথার স্কার্ফ বা হিজাব খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।সুমগাইতের কয়েকজন শিক্ষিকা জানিয়েছেন, তাঁদের স্কুল কর্তৃপক্ষ হিজাব খুলে ফেলা অথবা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।বাকুর একটি স্কুলের সূত্র বিবিসিকে জানিয়েছে, সরকারি আদেশে দাড়ি রাখার বিষয়ে কোনো নির্দেশনা না থাকলেও বয়সে বড় ছাত্রদের দাড়ি কেটে স্কুলে আসতে বলা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখা এবং সবার জন্য অভিন্ন পোশাকনীতি নিশ্চিত করাই তাদের উদ্দেশ্য।উল্লেখ্য, আজারবাইজানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৬ শতাংশ মুসলিম।বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভহিজাব নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে প্রথম ভিডিও প্রকাশ্যে আসে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় জালিলাবাদ অঞ্চল থেকে। এরপর আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে রাজধানী বাকু, এর আশপাশের গ্রাম এবং সুমগাইত শহরে।আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে কয়েকটি স্কুলের ছাত্ররাও ক্লাস বর্জন করে। বাকুর সাবুঞ্চু এলাকার শিক্ষার্থীরা ‘হিজাব শিক্ষায় কোনো বাধা নয়’ লেখা ব্যানার নিয়ে প্রতিবাদ জানায়। অন্যদিকে, খোখমেলি এলাকায় ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা তাঁদের ছেলেদেরও স্কুল থেকে সরিয়ে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।আন্দোলন দমনে কঠোর সরকারবিক্ষোভ মোকাবিলায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে আজারবাইজান সরকার। জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে একটি ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে কর্তৃপক্ষ।আটক ব্যক্তিদের নাম ও বয়স প্রকাশ করেনি দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার একটি স্কুলে আগুন দেওয়ার চেষ্টার সন্দেহে ছয় অপ্রাপ্তবয়স্ককে আটক করা হয়েছে।এদিকে, সাধারণ ব্যবহারকারীরা ইনস্টাগ্রাম ও টিকটক ব্যবহারে সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দুটি ব্লক করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।স্কুলের পোশাকবিধি নিয়ে মন্ত্রিপরিষদ কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয় কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও জবাব দেওয়া হয়নি।আলিয়েভের বক্তব্য ঘিরে আলোচনাএর আগে গত ২ অক্টোবর আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ তাঁর দলের কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে দেশকে মতাদর্শগত উসকানি থেকে রক্ষা করার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, আলিয়েভের এই বক্তব্য মূলত ইরানকে লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছিল।অন্যদিকে, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান স্কুলে হিজাব নিষেধাজ্ঞাকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন। এর প্রতিক্রিয়ায় আলিয়েভের ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে তুরস্কের গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর অভিযোগ তোলা হয়।নির্বাসিত সমালোচক আফগান মুখতারলি অভিযোগ করেছেন, ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতেই আলিয়েভ সরকার কাল্পনিক ‘উগ্র ইসলামপন্থী’ হুমকিকে ব্যবহার করছে।ধর্মীয় বিধিনিষেধের দীর্ঘ ইতিহাসআজারবাইজানে ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের ওপর সরকারি বিধিনিষেধ আরোপের ঘটনা নতুন নয়। ২০০৮ সালে একটি বোমা হামলার পর ঐতিহ্যবাহী আবু-বকর মসজিদ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরের বছর ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সংগঠন গঠন এবং ধর্মীয় বইপুস্তক বিতরণের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে কয়েকটি আইন পাস করা হয়। ২০০৯ সাল থেকে বন্ধ বা ভেঙে ফেলা মসজিদগুলোর বেশির ভাগই সুন্নি মুসলিমদের ছিল।২০০৯ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনার অধিকার কেবল আজারবাইজানে শিক্ষাপ্রাপ্ত নাগরিকদের জন্য সীমাবদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রসমর্থিত ককেশাস মুসলিম বোর্ডকে নামাজের ইমাম নিয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়।স্কুলছাত্রীদের হিজাব পরার ওপর অনানুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞার কারণে একসময় তাঁরা পরিচয়পত্র ও পাসপোর্টের ছবির জন্য ছবি তুলতেও সমস্যার মুখে পড়েছিলেন। ২০১১ সালের ৬ মে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামনে হিজাবের পক্ষে বিক্ষোভরত ব্যক্তিদের ওপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। ওই সময় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার পাশাপাশি তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।বিশিষ্ট সমাজকর্মী আবগুল সুলেমানভকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁর পরিবারের দাবি, হিজাব নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে তাঁকে নতুন করে ৩০ দিনের জন্য আটক করা হয়েছে।২০১৫ সালের শেষ দিকে দেশটির একটি গ্রামে অভিযান চালানোর সময় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত হন। অধিকারকর্মীদের দাবি, ওই সময় ৮৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।২০১৭ সালের জানুয়ারিতে একটি আদালত মুসলিম ইউনিটি মুভমেন্টের নেতা তালেহ বাগিরজাদে এবং তাঁর সহযোগী আব্বাস হুসাইনবকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়। পরে ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালত এ মামলার দুই আসামির ওপর নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগের ক্ষেত্রে অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তুলে ধরে রায় দেয়।২০১৫ সালের ডিসেম্বর থেকে বিদেশে পড়াশোনা করে আসা নাগরিকদের দেশটিতে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ২০১৮ সালে রাষ্ট্র পরিচালিত বাকু ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ২০২২ সালের একটি আইনের মাধ্যমে মসজিদের ইমাম নিয়োগের ক্ষমতা সরাসরি একটি সরকারি কমিটির হাতে তুলে দেওয়া হয়।এর আগে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বাকুর ঐতিহ্যবাহী হাজী জাভাদ মসজিদও ভেঙে ফেলে কর্তৃপক্ষ।বর্তমানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি তালিকায় আজারবাইজানের নাম রয়েছে।
/বিএসএস