ইয়েমেনে চলমান সংঘাতের কারণে যুদ্ধাহত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এতে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে তীব্র লড়াই ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় প্রায় ৮ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না জরুরি মানবিক সহায়তা। খাদ্য সরবরাহ কমে আসায় পরিস্থিতি আরও সংকটজনক হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থা।
আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) বুধবার (১৪ অক্টোবর) জানায়, ইয়েমেনের মারিব, তাইজ ও লোহিত সাগর উপকূলের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রের আঘাতে আহত বিপুলসংখ্যক মানুষকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো হাসপাতালে এক সপ্তাহে ৭০০ জনের বেশি আহত রোগী ভর্তি হয়েছেন।
জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) হিসাব অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী ও সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর মধ্যে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নতুন করে লড়াই শুরু হওয়ার পর ২ লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।
হাসপাতালে চিকিৎসার চাপ, সংকট প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের
আইসিআরসির স্বাস্থ্যবিষয়ক সমন্বয়ক ফেরাস আবুসামরা বলেন, যুদ্ধাহতদের চিকিৎসায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছেন। ইয়েমেনের যেসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর খুব অল্পসংখ্যকই গুরুতর আহতদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
তিনি জানান, হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচারের সরঞ্জাম, অ্যানেসথেশিয়া, অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি রয়েছে। ফলে সংঘাতে আহত মানুষের চিকিৎসা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি এবং বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাবে ইয়েমেনের স্বাস্থ্যব্যবস্থা আগে থেকেই বিপর্যস্ত। এর মধ্যে নতুন করে লড়াই তীব্র হলে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক আহত মানুষের চিকিৎসা দেওয়ার সক্ষমতা হারাতে পারে দেশটির হাসপাতালগুলো।
৮ লাখ মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না জরুরি সহায়তা
যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনের তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজসহ সংঘাতকবলিত বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৮ লাখ মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী সহায়তা পৌঁছানো বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)।
সংস্থাটি জানায়, বর্তমানে লড়াই থেকে পালিয়ে আসা সবচেয়ে বেশি মানুষ তাইজে আশ্রয় নিয়েছেন। তবে সংঘর্ষ ও সড়ক বন্ধ থাকায় কয়েকটি এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে এসব এলাকার মানুষের খাদ্য ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা পাওয়ার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতকবলিত এলাকাগুলোতে গমের আটার মজুত প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। স্থানীয় বাজারে যে সামান্য খাবার অবশিষ্ট রয়েছে, তা-ও অল্প সময়ের মধ্যে ফুরিয়ে যেতে পারে। এতে খাদ্যসংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা
ইয়েমেনে ডব্লিউএফপির প্রতিনিধি ও কান্ট্রি ডিরেক্টর এল-খিদির দালুম বলেন, নিরাপদে মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব না হলে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
সংঘাতের কারণে একদিকে আহত মানুষের চিকিৎসার প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো খাদ্য ও জরুরি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের ঘাটতি এবং দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে না পারার পরিস্থিতি সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।
ত্রাণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনে চিকিৎসাসেবা ও খাদ্য সরবরাহের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। তাই ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে নিরাপদে জরুরি মানবিক সহায়তা পৌঁছানো পরিস্থিতি মোকাবিলায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
/এএসএফ