• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৪২ এএম


মৃ’ত শাবক নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাতির পথচলা, সামনে এল বিস্ময়কর তথ্য

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ১০:৩৩ পিএম

নামিবিয়ার মরুভূমিতে একটি মৃত হাতিশাবককে শুঁড়ে জড়িয়ে বহন করতে দেখা গেছে এক মাদি হাতিকে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি ঘটনাটির মুখোমুখি হন। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল, হাতিটি নিজের মৃত সন্তানকে নিয়ে শোক প্রকাশ করছে। তবে পরে জানা যায়, শাবকটি তার নিজের নয়। বরং নিজের সন্তান হারানোর পর গত দুই বছরে অন্য হাতির চারটি মৃত শাবক বহন করতে দেখা গেছে এই হাতিটিকে।

ঘটনাটি ঘটে নামিবিয়ার মরুভূমির একটি শুকনো নদীখাতের কাছে। একদল হাতিকে অনুসরণ করার সময় ভেরোনেসির সামনে পড়ে মাদি হাতিটি। তার শুঁড়ে জড়িয়ে ছিল মৃত শাবকটির ছোট্ট পা, আর নিথর দেহটি বাতাসে ঝুলছিল।

ভেরোনেসি বলেন, ‘এটি ছিল এক অন্তরঙ্গ মুহূর্ত, প্রায় আধ্যাত্মিক। শিশুটির শরীর তখনও সম্পূর্ণ অক্ষত ও নরম ছিল। এটি তখনও শক্ত হয়ে যায়নি, তাই এটা স্পষ্ট যে তার জন্ম রাতে, বা হয়তো মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই হয়েছিল।’

প্রথম দেখায় দৃশ্যটি একজন মা হাতির শোক প্রকাশের ঘটনা বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু পরে ভেরোনেসি জানতে পারেন, হাতিটির আচরণের পেছনে রয়েছে আরও জটিল এক বিষয়। ঘটনাটি প্রাণীদের আবেগ ও শোক প্রকাশের ধরন সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার সুযোগ তৈরি করেছে।

কয়েক ঘণ্টা ধরে হাতির পালটির পিছু নিয়ে ভেরোনেসি বেশ কিছু ছবি তোলেন। তাঁর তোলা একটি ছবি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রধান পুরস্কার জিতেছে। ছবিগুলোতে হাতিদের আবেগপূর্ণ জীবনের এক বিরল দিক উঠে এসেছে।

ভেরোনেসি জানান, মাদি হাতিটি ঘণ্টার পর ঘণ্টা মৃত শাবকটিকে বহন করছিল। মাঝে মাঝে সেটিকে নিচে নামিয়ে যেন খাওয়ানোর বা পানি পান করানোর চেষ্টা করছিল, এরপর আবার তুলে নিয়ে হুয়াব নদী বরাবর চলতে থাকে।

তিনি বলেন, ‘আমি ভাবলাম, “এটা খুবই দুঃখজনক একটি দৃশ্য, কিন্তু মানুষের এটা দেখা প্রয়োজন”। এই ছবিটি স্পষ্ট করে দেয় যে এই হাতিগুলো কতটা কষ্ট পায়, তাদের কতটা জটিল অনুভূতি রয়েছে, যা মানুষ হয়তো পশুদের সঙ্গে মেলাতে পারে না।’

নিজের শাবক হারানোর পর অন্যের মৃত শাবক বহন

পরে জানা যায়, মৃত শাবকটি বহনকারী হাতিটি তার মা নয়। নামিবিয়ার মরুভূমির হাতিদের সুরক্ষায় কাজ করা অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইডের (ইএইচআরএ) সংরক্ষণ কর্মসূচির পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

উইন্টার বলেন, ‘সে (শাবক বহনকারী ওই হাতিটি) মা নয়।’

তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১৪ বছর বয়সী এই মাদি হাতিটি দুই বছর আগে নিজের শাবককে হারিয়েছিল। এরপর থেকে তাকে অন্য হাতির মৃত শাবক বহন করতে চারবার দেখা গেছে। উইন্টার আরও জানান, ওই এলাকায় এ ধরনের আচরণ এই প্রথম নথিভুক্ত করা হয়েছে।

ঘটনাটি জানার পর ভেরোনেসি বলেন, এই তথ্য ‘নিঃসন্দেহে এই প্রাণীগুলোর আবেগের গভীরতায় আরেকটি মাত্রা যোগ করে’। তাঁর মতে, নিজের শাবক হারানোর পরও হাতিটির এমন আচরণ আরও মর্মস্পর্শী। মনে হতে পারে, সে যেন নিজের হারানো সন্তানের সঙ্গে আবারও সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছে এবং বহু বছর পরেও সেই ক্ষতি ভুলতে পারেনি।

কেন মৃত শাবক বহন করে হাতিটি?

হাতিটি কেন দীর্ঘ সময় ধরে অন্যের মৃত শাবক বহন করছিল, তা নিয়ে কয়েকটি ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। ক্রিস্টিন উইন্টারের মতে, এ আচরণ এক ধরনের ‘আবেগীয় প্রক্রিয়াকরণ’ হতে পারে।

উইন্টার বলেন, হয়তো হাতিটি নিজের শোক সামলে ওঠার চেষ্টা করছে, কারণ সে এখনো সেই শোক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। শাবক হারানোর কারণে সে মানসিকভাবে এতটাই আঘাত পেয়ে থাকতে পারে যে অন্য কোনো শাবকের মৃত্যু দেখলেও তার মধ্যে একই ধরনের আচরণ দেখা দেয়।

তবে এর পেছনে অন্য কারণও থাকতে পারে। উইন্টারের ধারণা, হাতিটি মৃত শাবকটির ছোট্ট দেহ শিকারি প্রাণীদের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে থাকতে পারে।

নামিবিয়ার মরু হাতিদের জীবন ও অস্তিত্বের সংকট

ভেরোনেসির ছবিগুলো নামিবিয়ার প্রায় ১৫০টি মরু হাতির জীবনযাত্রারও একটি চিত্র তুলে ধরে। এসব হাতি নামিব মরুভূমির পাঁচটি নদীখাত বরাবর বসবাস করে। খাবার ও পানির সন্ধানে তাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। তাদের খাদ্যতালিকায় রয়েছে আনা গাছের (ফেইডারবিয়া আলবিডা) বীজকোষ এবং প্লাবনভূমির ঘাস।

মরু হাতিরা আলাদা কোনো প্রজাতি নয়; বরং তারা হাতির একটি বাস্তুতান্ত্রিক গোষ্ঠী। জিনগত অভিযোজনের পরিবর্তে অর্জিত আচরণের মাধ্যমে তারা শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করেছে। নামিবিয়ার স্কেলেটন কোস্ট এলাকায় বসবাসকারী মরু সিংহের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অভিযোজন দেখা যায়।

ক্রিস্টিন উইন্টার বলেন, এই হাতিদের অর্জিত জ্ঞানই তাদের বিশেষ করে তুলেছে। একই সঙ্গে এ কারণে তারা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কারণ একবার এই জ্ঞান হারিয়ে গেলে তা সহজে আবার অর্জন করা সম্ভব নয়।

উইন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরে নামিবিয়ার এই মরু হাতিদের সংখ্যা ক্রমাগত কমেছে। এর পেছনে পরিবেশগত চাপ, বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী খরা, আংশিকভাবে দায়ী। তবে হাতিদের সঙ্গে মানুষের সংঘাত বৃদ্ধি তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রধান কারণ বলে মনে করেন তিনি।

উইন্টার বলেন, সংঘাতের অন্যতম কারণ পানি। হাতিরা খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক উল্টে দেয়, পাইপ ছিঁড়ে ফেলে এবং পানির পাম্প ভেঙে দেয়। এ কারণে হাতিদের উপস্থিতি নিয়ে স্থানীয় মানুষের সহনশীলতা খুব বেশি নয়। তাঁর মতে, এসব ঘটনার গল্প মানুষের মনে গভীরভাবে গেঁথে থাকে এবং দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকে।

নবজাতক হাতিশাবকের মৃত্যুহার উদ্বেগজনক

মরু হাতিদের নবজাতক শাবকের মৃত্যুহারও বড় উদ্বেগের বিষয় বলে জানিয়েছেন উইন্টার। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এ হার অত্যন্ত বেশি ও ভীতিকর। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া মোট ১৬টি শাবকের মধ্যে মাত্র দুটি বেঁচে ছিল।

মরু হাতিদের এত বেশি শাবক মারা যাওয়ার পেছনে একটি সম্ভাব্য কারণ হিসেবে অপরিণত অবস্থায় জন্ম নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেছেন উইন্টার। তাঁর ধারণা, মা হাতিরা সব সময় শাবককে পূর্ণ গর্ভকাল পর্যন্ত ধারণ করার মতো সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে না।

এ ছাড়া মানুষের সঙ্গে সংঘাত থেকে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপও শাবকের মৃত্যুতে ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের সঙ্গে সংঘাতের প্রতিক্রিয়ায় হাতিরা পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বা পিটিএসডিতে ভুগতে পারে।

উইন্টার আরও জানান, ইএইচআরএ দলের সদস্যরা যখনই কোনো মৃত শাবকের সন্ধান পান, তখন সাধারণত সেটির আকার খুব ছোট হয়। একটি সুস্থ নবজাতক হাতির স্বাভাবিক ওজন প্রায় ১০০ থেকে ১২০ কেজি বা ২২০ থেকে ২৬৫ পাউন্ড। কিন্তু মৃত শাবকগুলোর ওজন পাওয়া যায় প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কেজি বা ১৩২ থেকে ১৪৩ পাউন্ড।

দূষণ ও মানসিক চাপের প্রভাব নিয়ে গবেষণা

পরিবেশগত কারণ এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নামিবিয়ার মরু হাতিদের কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা বোঝার জন্য ইএইচআরএ কাজ করছে ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের হাতি বিশেষজ্ঞ ও সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সঙ্গে।

২০২৮ সাল পর্যন্ত চলমান একটি প্রকল্পের আওতায় গবেষকেরা হাতির মলের নমুনা সংগ্রহ করছেন। এসব নমুনায় ভারী ধাতু ও স্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ, যেমন পিএফএএস, রয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি হাতিদের থাইরয়েড ও কর্টিসল হরমোনের মাত্রাও যাচাই করা হচ্ছে।

চুসিড বলেন, হাতির অন্য জনগোষ্ঠীর তুলনায় এই গোষ্ঠীর মধ্যে অন্তঃপ্রজননের মাত্রা কেমন, তা-ও তাঁরা নির্ধারণ করতে চান। পাশাপাশি বেঁচে থাকা শাবকদের পূর্বপুরুষের বংশপরিচয় মৃত শাবকদের তুলনায় আলাদা কি না, সেটিও গবেষণার অংশ।

হাতিরাও শোক ও কষ্ট অনুভব করে

আফ্রিকান সাভানা হাতির অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ এবং সংরক্ষণবিষয়ক অলাভজনক সংস্থা ‘এলিফ্যান্ট ভয়েসেস’-এর প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুল ভেরোনেসির ছবিগুলোকে ‘সত্যিই মর্মান্তিক’ বলে বর্ণনা করেছেন।

কেনিয়ায় একটি মা হাতিকে নিজের মৃত শাবকের প্রতি একই ধরনের আচরণ করতে দেখেছিলেন পুল। তবে সেই হাতিটি শাবককে বহন করেনি; বরং সেটিকে তোলার চেষ্টা করেছিল। এরপর দুই দিন ধরে শাবকটির পাশে দাঁড়িয়ে একই চেষ্টা চালিয়ে যায় বলে জানান তিনি।

পুল আশা করেন, ছবিগুলো মানুষকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করবে যে হাতিরাও শোক ও কষ্ট অনুভব করতে পারে।

হাতিরা তাদের সঙ্গী বা পরিবারের কোনো সদস্য মারা গেলে শোক প্রকাশ করে বলে মনে করা হয়। শুধু পরিবারের সদস্য নয়, অপরিচিত হাতির মৃতদেহের কাছেও তাদের যেতে দেখা গেছে। তারা মৃতদেহের হাড় স্পর্শ করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে মৃতদেহের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে—যা অনেকটা শোকসভার মতো আচরণ।

পুলের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নামিবিয়া সরকারের দেওয়া শিকারের অনুমতিও মরু হাতিদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। তাঁর ভাষায়, এসব হাতি বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। তাদের ওপর পড়া মানসিক আঘাত কমাতে আরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

প্রতিটি হাতির সুরক্ষার আহ্বান

ভেরোনেসির কাছে মা হাতি ও মৃত শাবকের মধ্যকার এই মিথস্ক্রিয়া ছিল ‘প্রায় মানবিক আচরণ’। তিনি বলেন, এ কারণেই ঘটনাটি তাঁর কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।

ভেরোনেসির ভাষ্য, তাঁর ছবির মাধ্যমে মানুষকে বোঝানো সম্ভব হতে পারে যে প্রতিটি হাতিই এমন একটি প্রাণী, যাকে বোঝা ও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। শুধু পুরো প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখাই যথেষ্ট নয়, প্রতিটি হাতির মঙ্গল নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

আলোকচিত্রী আশা করেন, তাঁর তোলা ছবিগুলো হাতিদের আবেগ, অনুভূতি ও মানসিক জগতের গভীরতা সম্পর্কে মানুষের সামনে একটি ছোট জানালা খুলে দেবে।

লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম আয়োজিত ও প্রযোজিত ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতার প্রদর্শনী ২০২৭ সালের জুলাই পর্যন্ত খোলা থাকবে।

/এসএন