• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩২ পিএম


স্কুলছাত্রী তাজমিনকে ধ’র্ষণের পর শ্বাসরো’ধে হ’ত্যা, ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সিএনজি চালকের স্বীকারোক্তি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ৯:৩৪ পিএম

কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানখেতের পাশ থেকে উদ্ধার হওয়া স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের কথা জানিয়েছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণে বাধা দেওয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া (৩৫) তাজমিনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন।

শনিবার (১০ অক্টোবর) সকালে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া।

পুলিশ জানায়, গত বুধবার রাত আনুমানিক সাড়ে ১২টার দিকে কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় যাওয়ার জন্য সুমনের সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। তবে পদুয়ার বাজার এলাকা থেকে শহরের দিকে না গিয়ে চালক অন্য উদ্দেশ্যে কিশোরীকে নিয়ে বিজরার দিকে রওনা হন। পরে বিভিন্ন সড়কে দীর্ঘ সময় ঘোরানোর পর তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যাওয়া হয়।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করেন সুমন। এ সময় কিশোরী বাধা দিলে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অটোরিকশাটি সড়কের পাশের ধানখেতে কাত হয়ে পড়ে যায়। এরপর তাজমিন দৌড়ে পালিয়ে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে। কিন্তু শারীরিক দুর্বলতার কারণে একপর্যায়ে সে কাবু হয়ে পড়ে।

জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত সুমন স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ, সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর নিজের গামছা তার গলায় পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন তিনি। হত্যাকাণ্ডের পর পাশের একটি পুকুরে গোসল করেন সুমন। এরপর নিহতের ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটি আইফোন নিয়ে নেন। মুঠোফোনটি স্থানীয় একটি ধানখেতে লুকিয়ে রেখে অটোরিকশাটি ফেলে রেখেই চট্টগ্রামের দিকে পালিয়ে যান তিনি।

ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা অটোরিকশার রেজিস্ট্রেশন নম্বরের সূত্র ধরে পুলিশ ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি ও লালমাই থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীর একটি এলাকা থেকে সুমনকে গ্রেপ্তার করে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পঙ্কজ বড়ুয়া জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন পুরো ঘটনার দায় স্বীকার করেছেন। তাঁকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে।

আদালতে অভিযুক্ত স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, আসামিকে আদালতে উপস্থাপনের পরই এ বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান, গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক (এসআই) পবিত্র সরকার ও উপপরিদর্শক অর্ণবসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

যেভাবে উদ্ধার হয় তাজমিনের মরদেহ

এর আগে বৃহস্পতিবার সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। পুলিশ জানায়, গত ৮ অক্টোবর সকালে লালমাই উপজেলার ভোরাজগৎপুর এলাকার ধানখেতের আইলের পাশে মরদেহটি পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় বাসিন্দারা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন।

খবর পেয়ে লালমাই থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিচয় শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। খবর পেয়ে তাজমিনের বাবা সেখানে গিয়ে মরদেহটি তাঁর মেয়ের বলে শনাক্ত করেন।

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিম ও কেয়া আক্তার দম্পতির মেয়ে। তাঁর বাবার চাকরির সুবাদে পরিবারটি কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করত। আব্দুল আলিম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত। তাজমিন কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তন স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

স্কুল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে তাজমিন আর স্কুলে যাচ্ছিল না।

বাবার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। বুধবার রাত ১২টা ১৯ মিনিটে তাকে সর্বশেষ কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায়।

পরবর্তী সময়ে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠায় তাজমিন। একই সঙ্গে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানিয়ে একটি বার্তাও পাঠায় সে। কিন্তু গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় বার্তাটি সময়মতো দেখতে পারেননি। পরদিন সকালে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়ার পর স্বজনেরা তাজমিনকে শনাক্ত করেন।

এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতপরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা করেন।

চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার, উদ্ধার আইফোন

পুলিশ জানিয়েছে, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ডিবি ও লালমাই থানা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে চট্টগ্রাম থেকে সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাগমারা এলাকার একটি পুকুরপাড়ের জঙ্গল থেকে তাজমিনের আইফোন উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অটোরিকশাটিও উদ্ধার করেছে পুলিশ।

সুমনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে তাঁকে আদালতে সোপর্দ করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

/এসএন