চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ত নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) ১৫ বছরের জন্য একটি আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটরের কাছে হস্তান্তরের খসড়া চুক্তিতে নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য এ চুক্তি করা হবে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রকল্প তথ্য অনুযায়ী, দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির আওতায় এনসিটির আধুনিকায়ন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত চুক্তির আগে আরও কিছু সরকারি অনুমোদন ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
বর্তমানে এনসিটি পরিচালনা করছে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর মালিকানাধীন চট্টগ্রাম ড্রাই ডক কোম্পানি লিমিটেড। টার্মিনালটিতে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডেল করা হয়। ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডেল হওয়া মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে এনসিটি ছাড়াও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি), জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) এবং পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) চালু রয়েছে। এর মধ্যে পিসিটি সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২২ বছরের চুক্তিতে পরিচালনা করছে।
এনসিটি পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটর আনার আলোচনা নতুন নয়। ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি প্রথম এ প্রকল্পে নীতিগত অনুমোদন দেয়। সর্বশেষ অনুমোদনটি মূলত ১৫ বছরের জন্য এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনার খসড়া কনসেশন চুক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
সরকার ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে এনসিটি নিয়ে কয়েক বছর ধরেই আলোচনা চলছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রক্রিয়াটি এগোলেও খসড়া চুক্তি পর্যালোচনার জন্য ডিপি ওয়ার্ল্ড অতিরিক্ত সময় চাওয়ায় তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি। পরে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আবারও আলোচনা শুরু হয়।
গত মে মাসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পিপিপি মডেলের আওতায় এনসিটি পরিচালনার প্রস্তাব মূল্যায়নের জন্য গঠিত কমিটি পুনর্গঠনের নির্দেশ দেয়। এরপর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আলোচনা কমিটিকে সহায়তার জন্য ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিম গঠন করে।
এ প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) ট্রানজেকশন অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করছে। প্রকল্পের যাচাই-বাছাই, লেনদেনের কাঠামো তৈরি, প্রস্তাব আহ্বান ও কনসেশন চুক্তির খসড়া তৈরির পাশাপাশি নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অপারেটরের সঙ্গে আলোচনাতেও আইএফসি সহায়তা করছে।
এদিকে এনসিটি হস্তান্তরের প্রক্রিয়ার মধ্যেই একই দিনে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দুটি চিঠি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। নথিপত্র অনুযায়ী, একটি চিঠিতে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চলমান ইজারা প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করা অথবা তা বাতিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আরেকটি চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে বলা হয়।
দুটি ভিন্ন নির্দেশনায় বন্দরসংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও বৃহস্পতিবারের নীতিগত অনুমোদনের ফলে এনসিটি ও ওসিওয়াইয়ের কনসেশন চুক্তি চূড়ান্ত করার আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সক্রিয় রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
চূড়ান্ত চুক্তিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর কোন শর্তে এনসিটি ও ওসিওয়াই পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে, তা নির্ধারণ করা হবে। এর মধ্যে উভয় পক্ষের আর্থিক ও পরিচালনাগত দায়িত্বও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগে সরকারের বাকি অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।
এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালকে ২২ বছরের চুক্তিতে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালসকে দীর্ঘমেয়াদি পিপিপি চুক্তির আওতায় লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এনসিটির প্রস্তাবিত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আরও বাড়বে।
/এএসএফ