এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সাড়ে আট বছরে কোনো ধরনের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বা পরীক্ষা ছাড়াই ইসলামী ব্যাংকে ৮ হাজার ৫৪২ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক তদন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ এস আলম গ্রুপের হাতে থাকার সময়ে নিয়মবহির্ভূতভাবে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব নিয়োগপ্রাপ্তের প্রায় ৭৫ শতাংশ বা ৮ হাজার ৯৯ জনই চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনের বাড়ি এস আলমের নিজ উপজেলা পটিয়ায়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত বা সিভি সংগ্রহ করা হতো এস আলমের চট্টগ্রাম ও পটিয়ার বাসভবনে রাখা বিশেষ বাক্সের মাধ্যমে।
ইসলামী ব্যাংকের প্রচলিত নিয়োগ বিধান অনুযায়ী, কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। এরপর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান রয়েছে। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়াকে ন্যূনতম যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
তবে ২০১৭ সালে ব্যাংকের মালিকানায় পরিবর্তনের পর ওই বিধান অনুসরণ না করেই ৮ হাজার ৫৪২ জনকে জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দিতে ওই সময় ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়েছিল। নীতিমালার ৭.০৪ ধারায় যুক্ত করা হয়, ‘জরুরি প্রয়োজন দেখা দিলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (এমডি ও সিইও) জনবলের প্রয়োজন অনুযায়ী এন্ট্রি লেভেল ও লেটারাল এন্ট্রি গ্রেডে কর্মী নিয়োগ করতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে তার পদমর্যাদার অবিলম্বে নিচের দুই স্তর বাদে নিয়োগের ক্ষেত্রে উল্লিখিত আনুষ্ঠানিকতা শিথিল করা যাবে।’
তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এই বিধানের পাশাপাশি নীতিমালার ৭.০১ ধারাও লঙ্ঘন করা হয়েছে। ৭.০১ ধারায় বলা হয়েছে, সাধারণত বিভিন্ন গ্রেডে নিয়োগের ক্ষেত্রে কমপক্ষে দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে এবং যোগ্য প্রার্থীদের আবেদন করার জন্য অন্তত ১৫ দিন সময় দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, নিয়োগ বিধিমালায় সাধারণত এ ধরনের ধারা রাখা হয়, যাতে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যাংকের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে লেটারাল এন্ট্রির এক-দুটি পদ অথবা কারিগরি পদে কর্মী নিয়োগ করা যায়।
কিন্তু ইসলামী ব্যাংকে ওই ধারা নতুন করে সংযোজনের পর প্রবেশনারি এন্ট্রি পদেই ছয় হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ ধরনের নিয়োগকে খুবই অস্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন সংযোজিত ধারায় ‘জরুরি প্রয়োজন’ দেখা দেওয়ার কথা বলা হলেও ওই সময় ব্যাংকে কর্মরত কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তখন ব্যাংকটিতে বড় ধরনের জনবল সংকট ছিল না।
বরং ওই সময়ে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই যে পরিমাণ কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তা ব্যাংকের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি ছিল বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
/এসএন