দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা সামরিক সম্পৃক্ততার অবসান ঘটিয়ে বুধবারের মধ্যে ইরাক থেকে তাদের শেষ ঘাঁটিগুলোও গুটিয়ে নিতে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী। এর মাধ্যমে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির পুরোপুরি সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে সাড়ে চার হাজারের বেশি মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের মেয়াদে ২০২৪ সালে সেনা প্রত্যাহারের বিষয়ে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সেই চুক্তি বাস্তবায়ন করছে। তবে একই সময়ে ওয়াশিংটন ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরাক থেকে মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান তেহরান ও দেশটির শক্তিশালী মিত্রদের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামিক স্টেট বা আইএসসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য শত্রুরাও নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নিয়ে কাজ করা ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের ইরাক ছাড়ার ফলে ইরান কৌশলগতভাবে লাভবান হবে। তার মতে, এই প্রস্থান এমন একটি সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটাবে, যা দীর্ঘদিন ধরে ইরাকে ইরানের প্রভাবের বিপরীতে এক ধরনের ভারসাম্য বজায় রেখেছিল।জাসিম আল-বাহাদলি আরও বলেন, ইরানপন্থি প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিজেদের আন্দোলন ও বিজয়ের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে পারে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়ানোর চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি পূর্বাভাস দেন।অন্যদিকে, ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ছায়া সংগঠন ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’-এর কমান্ডার আবু মোজতবা আল-ইয়াসিরি মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ‘ঐতিহাসিক বিজয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।রয়টার্সকে তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি কালো অধ্যায়ের সমাপ্তি এবং দেশের ওপর দখলদারিত্ব চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টার ব্যর্থতা উদযাপন করা হবে।তবে মার্কিন বাহিনীর এই প্রত্যাহার নিয়ে ইরাকের অভ্যন্তরেও উদ্বেগ রয়েছে। ফালুজাহর সুন্নি উপজাতীয় নেতা আবদুর রহমান আল-জোবাই বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয় বলে তারা মনে করেন।তিনি বলেন, সব ইরাকিই পূর্ণ সার্বভৌমত্ব চায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোট এভাবে চলে গেলে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, সেটিই সবার জন্য উদ্বেগের বিষয়।২০০৩ সালে সুন্নি একনায়ক সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইরাকে সামরিক আগ্রাসন চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০১১ সালের শেষ দিকে মার্কিন বাহিনী দেশটি থেকে সরে যায়।এরপর ২০১৪ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সুন্নি জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটকে পরাস্ত করতে ইরাকি বাহিনীকে সহায়তা করার জন্য মার্কিন সেনারা আবারও ইরাকে ফিরে আসে। আফগানিস্তান থেকে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক সেনা প্রত্যাহারের তুলনায় ইরাকে ‘অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম’-এ প্রায় দ্বিগুণ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিল।সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক ছিল এমন একটি দেশ, যেটি একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলছিল। তবে বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের মধ্যে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা এবং সৌদি আরবের একটি পাইপলাইনে হামলার পেছনে ইরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ করে আসছে ওয়াশিংটন।এদিকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইসলামিক স্টেটের জঙ্গিরা আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ইরাকের ফেডারেল সরকার এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা।কুর্দি কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি জানান, সেপ্টেম্বরের মধ্যে আন্তর্জাতিক জোটের আনুষ্ঠানিক প্রত্যাহারের ঘোষণা আসার পর থেকেই আইএসের ‘স্লিপার সেল’গুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।এ ছাড়া ইরাকি নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে আত্মঘাতী হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে আইএসের একটি সেল।
/বিএসএস