বিএনপি সরকারের ১৮০ দিনের কর্মকাণ্ডে চরম অব্যবস্থাপনা ও অপরিকল্পনার কারণে জনভোগান্তি ব্যাপকভাবে বেড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।রোববার (২৩ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার নিজেদের ব্যর্থতা স্বীকার না করে ১৮০ দিনের একটি সাফল্যমণ্ডিত চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তার দাবি, এটি জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। অতীতে আওয়ামী লীগকে যে ধরনের প্রতারণার রাজনীতি করতে দেখা গেছে, বিএনপি সরকারও এখন একই ধরনের রাজনীতি করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।এর আগে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ১১ দলীয় ঐক্যের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকসহ শরিক দলগুলোর নেতারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ বাস্তবায়নসহ চলমান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের প্রতি জনআস্থা একেবারেই তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। কারণ, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিস্থিতি অন্তর্বর্তী সরকার কিংবা বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের চেয়েও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি ও গ্যাস সংকটও শুরু হয়েছে। গ্যাস ও সিলিন্ডারের দাম বেড়েছে। কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং সারাদেশে আরও কয়েকশ কারখানা বন্ধ হওয়ার পথে। এতে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একদিকে চাঁদাবাজির ভোগান্তি, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ না পাওয়ায় মানুষ ও ব্যবসায়ীরা সমস্যায় পড়েছেন। পাশাপাশি সার সংকটের কারণে কৃষকরাও ভোগান্তিতে রয়েছেন।নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের ব্যর্থতার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচিত ছিল জনগণের কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং বিরোধী দলসহ জনগণের সহযোগিতা কামনা করা। কিন্তু তা না করে সরকার মিথ্যা তথ্য দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।তার ভাষ্য, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন না করা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেওয়ার মধ্য দিয়েই সরকার প্রতারণার কাজ শুরু করেছে।নাহিদ ইসলাম বলেন, তারেক রহমান দেশে ফিরে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’—তিনি দেশকে স্থিতিশীল করতে পারবেন এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে পারবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, সরকারের পুরো ১৮০ দিনই অব্যবস্থাপনায় কেটেছে।তিনি বলেন, সরকারের অপরিকল্পনার কারণেই মাত্র ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠন করতে হয়েছে। সামনে আরও পরিবর্তন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার দাবি, সবকিছু অপরিকল্পিতভাবে গঠন করা হয়েছে এবং বেশিরভাগ মন্ত্রীই ব্যর্থ হবেন।নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার বিরোধী দলের কাছে পরিকল্পনা চেয়েছিল। জ্বালানি নিয়ে গঠিত কমিটিতে বিরোধী দল তাদের প্রস্তাব দিয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে ওই কমিটিকে কার্যকর হতে দেওয়া হয়নি এবং এর প্রতিবেদন নিয়েও কোনো আলোচনা হয়নি। ফলে সরকারের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশবাসী ভুগছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, জনগণের সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজ শুরু করা উচিত। একই সঙ্গে জ্বালানি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি জাতীয় নীতি প্রণয়ন করতে হবে।স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ব্যর্থতার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা আশা করেছিলেন হয়তো এই মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসবে। কারণ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতোমধ্যেই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। সরকারের উচিত মন্ত্রণালয়টি পুনর্গঠন করা। প্রয়োজনে বিরোধী দল সরকারকে নীতিগতভাবে সহযোগিতা করবে বলেও জানান তিনি।সরকারের পররাষ্ট্রনীতির সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকারের পররাষ্ট্রনীতি যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসহীন। ভারত সফর করবে কি না, সে বিষয়ে সরকার জনগণকে কোনো সুস্পষ্ট বার্তা দিতে পারছে না।তিনি বলেন, ৫ আগস্ট দিল্লিতে আওয়ামী লীগকে যে প্রেস ব্রিফিং করতে দেওয়া হয়েছিল, এর জন্য ভারত সরকারকে যথাযথ জবাবদিহিতার আওতায় আনতেও সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তার মতে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে দিল্লিতে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিয়ে একই সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে ভারতের সুসম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব নয়।নাহিদ ইসলাম বলেন, তারা যেকোনো দেশের সঙ্গে মর্যাদা ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক চান। বাংলাদেশ-ভারতের পারস্পরিক সমস্যাগুলো—গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া, অন্যান্য নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা ও পুশ-ইনসহ বিভিন্ন বিষয়—খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে নতুন পররাষ্ট্রনীতি ও সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এগোতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।শেখ হাসিনার বিচার ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর জাতির জন্য কল্যাণকর হবে না বলে ১১ দল মনে করছে বলেও জানান নাহিদ ইসলাম।এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, সরকার এক কোটি কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও তারা কোনো কর্মসংস্থান করতে পারেনি। চাকরির পরীক্ষা ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির অভিযোগও আসছে বলে দাবি করেন তিনি।তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আবারও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য তৈরি করা হচ্ছে এবং নজিরবিহীনভাবে সরকার দলীয়করণ করেছে। সরকার জুলাই সনদ, গণভোট এবং তাদের নিজেদের ৩১ দফার কোনোটিই অনুসরণ করছে না। ফলে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও তারা রক্ষা করছে না।নাহিদ ইসলাম বলেন, সরকার যদি তাদের প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে সংসদের বাইরে গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। সে লক্ষ্যেই তারা জনগণের কাছে যাচ্ছেন এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করছেন।তিনি বলেন, সরকার যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে, তাহলে ১১ দল গণতান্ত্রিকভাবে রাজপথে তার জবাব দেবে।
/বিএসএস