শেরপুরে টানা তিন দিন ধরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন প্রায় ৪ হাজার আবাসিক গ্রাহক। গ্যাস না থাকায় অনেক বাড়িতে রান্নাবান্না বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেউ বাড়তি টাকা খরচ করে হোটেল থেকে খাবার কিনছেন, আবার কেউ ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে লাকড়ি জ্বালিয়ে রান্নার চেষ্টা করছেন। বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহেও দেখা দিয়েছে সংকট।
শুধু আবাসিক গ্রাহকরাই নন, গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতেও। জেলার একমাত্র সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সিএনজিচালিত যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তির পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত বুধবার (১২ আগস্ট) রাত ১০টার পর হঠাৎ শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার পার হলেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। এভাবে প্রায় ৬২ ঘণ্টা ধরে আবাসিক ও বাণিজ্যিক গ্রাহকেরা গ্যাসবিহীন অবস্থায় রয়েছেন। তবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে ঠিক কত সময় লাগবে, সে বিষয়ে এখনো নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোতে এই সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। বিশেষ করে রান্নার বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন গৃহিণীরা। শহর এলাকায় লাকড়ি কিংবা মাটির চুলা ব্যবহারের সুযোগও সীমিত। ফলে অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছে।
শেরপুর শহরের রাজাবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা শারমিন জাহান বলেন, কয়েক দিন ধরে গ্যাস না থাকায় ঘরে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে হোটেল থেকে খাবার কিনতে হচ্ছে। গ্যাস কখন আসবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি বাড়ির ছাদে ইট দিয়ে অস্থায়ী চুলা তৈরি করে রান্নার ব্যবস্থা করেছেন। জরুরি গৃহস্থালি কাজের কথা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় গ্যাস সরবরাহের দাবি জানান তিনি।
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন ব্যবস্থাতেও। শেরপুরে থাকা একমাত্র সিএনজি স্টেশনে গ্যাস না থাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চলাচল কমে গেছে। ফলে বিভিন্ন রুটে পরিবহন সংকট তৈরি হয়েছে। যাত্রীদের অভিযোগ, এই সুযোগে কিছু যানবাহনে বাড়তি ভাড়াও নেওয়া হচ্ছে।
সিএনজিচালক আবুল হোসেন বলেন, গ্যাস না থাকলে গাড়ি চালানোর সুযোগ নেই। অথচ সিএনজি চালিয়েই তাঁদের সংসারের খরচ চলে। কয়েক দিন ধরে গাড়ি চালাতে না পারায় তাঁদের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ চালুর দাবি জানান তিনি।
তিতাস গ্যাসের শেরপুর জেলার ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. বদরুজ্জামান জানান, গত ১২ আগস্ট রাত ১০টা থেকে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, মাতারবাড়ী ও মহেশখালী এলাকার এলএনজি টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে শেরপুরেও। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও পাঁচ থেকে সাত দিন সময় লাগতে পারে বলে জানান তিনি।
তিতাস গ্যাসের তথ্য অনুযায়ী, শেরপুরে প্রায় ৪ হাজার আবাসিক গ্রাহক রয়েছেন। জেলায় বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে ২২টি। এ ছাড়া একটি সিএনজি স্টেশন রয়েছে। শেরপুরে প্রতি মাসে আনুমানিক ২৭ থেকে ৩২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপ থাকে ২০ থেকে ২২ পিএসআই। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও মাতারবাড়ী অঞ্চল থেকে মূলত শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ করা হয়ে থাকে।
তবে শেরপুরে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার পেছনে তিতাসের পাইপলাইনে কোনো ত্রুটি নেই বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তিতাস গ্যাসের মিডিয়া ও জনসংযোগ শাখার ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন বলেন, গ্যাস সরবরাহের জন্য তিতাসের পাইপলাইন ব্যবস্থা প্রস্তুত রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে গ্রাহকদের কাছে সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বিষয়টিকে জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে। তবে ঠিক কত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা বলা সম্ভব নয়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুহাম্মদ আরিফ সাদেক বলেন, শেরপুরে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টি তাঁদের জানা ছিল না। গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তিতাস গ্যাসই দিতে পারবে বলে জানান তিনি। তবে জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সংকট রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা আরও জানান, কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে অবস্থিত সামিট এলএনজি টার্মিনাল বা ভাসমান স্টোরেজ ও রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) থেকে গতকাল সন্ধ্যা থেকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে কিছুটা সরবরাহ শুরু হয়েছে। তবে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে।
জাতীয় পর্যায়ে গ্যাস সরবরাহ বাড়লে শেরপুরের সংকটও কাটবে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে শেরপুরে গত দুই-তিন দিন ধরে সম্পূর্ণভাবে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকার বিষয়টিও খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা।
/এসএন