• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৫ এএম


বিয়ে ‘কঠিন’ হওয়ায় বাড়ছে অনৈতিকতা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৪ আগস্ট ২০২৬ ৫:১৮ পিএম

বর্তমান সমাজে একটি অদ্ভুত ও উদ্বেগজনক বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে—বৈধ বন্ধন ‘বিয়ে’ দিনদিন কঠিন হয়ে উঠছে, অথচ অবৈধ ও সাময়িক প্রেম, লিভ-ইন রিলেশনশিপ কিংবা বিভিন্ন ধরনের ‘সম্পর্ক’ যেন ক্রমেই সহজলভ্য ও স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। যে বিয়ে সমাজে স্থিতিশীলতা আনে, পরিবার গঠন করে এবং চরিত্র রক্ষায় ভূমিকা রাখে, তা আজ নানা সামাজিক ও আর্থিক জটিলতায় জর্জরিত।অন্যদিকে, যেসব অনৈতিক সম্পর্ক সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ায় ও মানসিক অস্থিরতা তৈরি করে, সেগুলো ফ্যাশন ও আধুনিকতার আবরণে অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে। ফলে তরুণ সমাজ একটি দ্বিমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।সংকটের বর্তমান চিত্রতরুণ সমাজের একটি বড় অংশ আজ সঠিক সময়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছে না। এর পেছনে রয়েছে ক্যারিয়ার নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বেগ, প্রতিষ্ঠিত হওয়ার তথাকথিত মানদণ্ড, সামাজিক প্রতিযোগিতা এবং বিয়েতে বড় আয়োজন করার মানসিকতা।একজন তরুণ পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ত্রিশের কাছাকাছি বয়সে পৌঁছে যায়। এরপর থাকে সামাজিক ও পারিবারিক প্রত্যাশার চাপ। অন্যদিকে, বয়সের স্বাভাবিক নিয়মেই মানুষের জৈবিক ও মানসিক চাহিদা তৈরি হয়। বিয়ে যখন কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়, তখন কেউ কেউ বিকল্প হিসেবে সহজ সম্পর্ক বা অনৈতিক প্রেমের দিকে ঝুঁকে পড়ে।আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের ফলে এসব সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার সুযোগও এখন অনেক সহজ। এর ফলে পারিবারিক অবক্ষয়, মানসিক বিষাদ, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জটিলতা এবং শেষ পর্যন্ত হতাশা বাড়ছে।বিয়ে কেন কঠিন হলো?বিয়ে কঠিন হয়ে ওঠার পেছনে বেশ কয়েকটি সামাজিক কারণ রয়েছে।অতিরিক্ত খরচ ও সামাজিক জাঁকজমক: গায়ে হলুদ, প্রি-ওয়েডিং শুট, ডেস্টিনেশন ওয়েডিং কিংবা বিশাল কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া—অনেক ক্ষেত্রে বিয়ে এখন বড় ধরনের ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। ফলে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত তরুণদের কাছে বিয়ে একটি ভীতিকর স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।মোহরানা নিয়ে ভুল ধারণা: মোহরানা নারীর অধিকার হলেও অনেক ক্ষেত্রে এটিকে বরপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা যাচাইয়ের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়। সামর্থ্যের বাইরে বড় অঙ্কের মোহরানা নির্ধারণ বিয়েকে জটিল করে তুলতে পারে।প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অবাস্তব মানদণ্ড: চাকরি, নিজস্ব ফ্ল্যাট বা গাড়ি না থাকলে অনেক তরুণ বিয়ের প্রস্তাব দিতেও দ্বিধা করেন। অথচ সংসার অনেক সময় দুজন মিলে শূন্য থেকে গড়ে তোলার বিষয়—এই উপলব্ধি সমাজে ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে।সংস্কৃতির প্রভাব: অনৈতিক ও সাময়িক সম্পর্ককে সহজ ও আকর্ষণীয় হিসেবে উপস্থাপনের ক্ষেত্রে পশ্চিমা জীবনধারা ও গণমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন লেখক। দায়িত্বহীন সম্পর্ককে যেখানে রঙিন করে দেখানো হয়, সেখানে বিয়েকে কখনো কখনো এক ধরনের ‘শিকল’ বা চাপ হিসেবে তুলে ধরা হয়।ইসলামের নির্দেশনাইসলাম মানবপ্রকৃতিকে বিবেচনায় রেখে বিয়েকে সহজ, বরকতময় ও প্রশংসনীয় কাজ হিসেবে নির্ধারণ করেছে এবং অনৈতিক পথ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে।কুরআন মাজিদে আল্লাহতায়ালা বলেন—‘আর তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত, তাদের বিয়ে সম্পন্ন করো… তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদের সচ্ছলতা দান করবেন।’ (সূরা আন-নূর : ৩২)।এই আয়াতের শিক্ষা হলো, সম্পূর্ণ অর্থবিত্ত বা প্রাচুর্যের অপেক্ষায় না থেকে প্রয়োজনীয় যোগ্যতা অর্জনের পর বিয়ের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.) বিয়ে সহজ করার বিষয়ে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন—‘সবচেয়ে বরকতময় বিয়ে তা-ই, যাতে খরচ ও ঝুটঝামেলা সবচেয়ে কম।’ (মুসনাদে আহমাদ)।ইসলামে বিয়ের মূল শর্তগুলোও মৌলিক। পাত্র-পাত্রীর সম্মতি, অভিভাবকের সায়, দুজন সাক্ষী এবং পাত্রের সামর্থ্য অনুযায়ী মোহরানা নির্ধারণের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করা যায়। বিয়েতে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন বাধ্যতামূলক নয়। সামান্য ওয়ালিমা বা আহারের আয়োজনের মাধ্যমেও সুন্নাহ পালন করা যায়।মোহরানা প্রসঙ্গে ইসলামে বরের সামর্থ্য বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। সামান্য লোহার আংটি কিংবা কুরআনের কিছু অংশ শেখানোর মাধ্যমেও বিয়ের দৃষ্টান্ত রয়েছে। মোহরানা দিয়ে নারীকে সম্মান জানানো ইসলামি বিধান হলেও সেটিকে বিয়ের পথে অযথা বাধা বানানো ইসলামের শিক্ষা নয়।সংকট উত্তরণের উপায়তরুণ সমাজকে এ নৈতিক ও মানসিক সংকট থেকে বের করে আনতে হলে সামগ্রিক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের বুঝতে হবে, সন্তানের চারিত্রিক পবিত্রতা ও মানসিক শান্তির জন্য বিয়েকে সহজ করা জরুরি।উচ্চাকাঙ্ক্ষার পাহাড় দাঁড় না করিয়ে সততা ও দায়িত্বশীলতাকে বিয়ের মূল মানদণ্ড করা উচিত। বিয়েতে অতিরিক্ত খরচ, অপ্রয়োজনীয় রীতিনীতি ও লোকদেখানো প্রদর্শনী বন্ধ করে সাধারণ আয়োজনে বিয়ে সম্পন্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।তরুণদেরও শুধু ক্যারিয়ারের পেছনে না ছুটে সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি অনৈতিক সম্পর্কের সাময়িক ও অনিশ্চিত স্থায়িত্বের পরিবর্তে বৈধ ও পবিত্র বন্ধনের গুরুত্ব উপলব্ধি করা প্রয়োজন।জুমার খুতবা, ওয়াজ মাহফিল ও গণমাধ্যমে বিয়ের সহজ ইসলামি রূপ এবং অনৈতিক সম্পর্কের ক্ষতিকর দিক নিয়ে সামাজিক আলোচনা বাড়ানো যেতে পারে।বিয়ে কোনো জটিল সামাজিক পরীক্ষা নয়; বরং এটি জীবনকে শান্তিময় করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্ধন। বিয়েকে সহজ করা গেলে সমাজে পাপাচার ও মানসিক অস্থিরতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা সম্ভব। তরুণ সমাজকে রক্ষা এবং সুস্থ ও সুন্দর পরিবারব্যবস্থা বজায় রাখতে তাই ‘সহজ বিয়ে’র সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেওয়া এবং অনৈতিকতার পথ রুদ্ধ করার উদ্যোগ প্রয়োজন।

/বিএসএস