• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১০:০৭ পিএম


কোর্ট ম্যারেজ’ ভেবে প্রতারণার শিকার, আদালতে গিয়ে জানলেন বিয়েই হয়নি!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৮ আগস্ট ২০২৬ ৮:৫৪ এএম

প্রেমের সম্পর্ক কিংবা পরিবারের অমতে বিয়ে করতে চাওয়া তরুণ-তরুণীদের টার্গেট করে মেহেরপুরে ‘কোর্ট ম্যারেজ’-এর নামে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। নোটারি পাবলিকের কার্যালয়ে নিয়ে ১৫০ বা ৩০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে হলফনামা বা এফিডেভিটে স্বাক্ষর করিয়ে সেটিকেই ‘কোর্ট ম্যারেজ’ হিসেবে প্রচার করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। পরে দাম্পত্যে বিরোধ, প্রতারণা কিংবা বিচ্ছেদের সময় আদালতের দ্বারস্থ হয়ে অনেকে জানতে পারছেন, তাদের বিয়ের কোনো বৈধ নিবন্ধনই হয়নি।

মেহেরপুরে গত কয়েক মাস ধরে পরিচালিত অনুসন্ধানে এমন শতাধিক নথি, তথ্য ও অনিয়মের ঘটনা সামনে এসেছে। শুধু ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নয়, নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার, বাল্যবিয়েতে এফিডেভিট ব্যবহার, পরিচয় জালিয়াতি, বিদেশে থাকা ব্যক্তির নামে ভুয়া স্বাক্ষর এবং দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র ছাড়াই বিদেশি নাগরিককে ঘিরে বিতর্কিত নথি তৈরির অভিযোগও পাওয়া গেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মেহেরপুরে সক্রিয় একটি চক্র নোটারি এফিডেভিটকে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ হিসেবে উপস্থাপন করে বাল্যবিয়ে, ভুয়া পরিচয় ও জাল স্বাক্ষরের মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়েকেও প্রয়োজনীয় দূতাবাসের অনাপত্তিপত্র ছাড়াই বৈধ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তির ক্ষেত্রে এফিডেভিটের মাধ্যমে তালাক সম্পাদনের ঘটনাও সামনে এসেছে।

আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে আলাদা কোনো বিয়ের বিধান নেই। মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী মুসলিম বিয়ে নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে নিবন্ধন করতে হয়। নোটারি এফিডেভিট মূলত একটি হলফনামা বা ঘোষণাপত্র; এটি কাবিননামা কিংবা নিবন্ধিত বিবাহের বিকল্প নয়।

ফলে শুধু এফিডেভিটের ওপর নির্ভর করে দাম্পত্য জীবন শুরু করলে পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে নারীরা দেনমোহর, ভরণ-পোষণ, উত্তরাধিকার এবং অন্যান্য দাম্পত্য অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

অনুসন্ধানে মেহেরপুর পৌরসভার হালদারপাড়ার সাদিয়া আক্তার রুমী (পূর্বনাম পূজা) ও হীরক হকের বিবাহসংক্রান্ত একটি এফিডেভিটেও একাধিক অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া গেছে। নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৮ এপ্রিল রুমী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং একই দিনে হীরক হকের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

এফিডেভিটে উল্লেখ করা হয়, ওই সময় হীরক হক বিদেশে ছিলেন এবং ভিডিও কলে তাদের বিয়ে হয়। কিন্তু বিদেশে থাকা সত্ত্বেও ওই এফিডেভিটে হীরক হকের স্বাক্ষর রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নোটারি পাবলিকের সামনে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে এভাবে এফিডেভিটে স্বাক্ষর করার সুযোগ নেই।

এছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের নামের সঙ্গে অমিল এবং নির্ধারিত ৩০০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকার স্ট্যাম্প ব্যবহারের মতো অসঙ্গতিও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট এফিডেভিটে আইনজীবী অ্যাডভোকেট নুরজামাল (জামান) এবং নোটারি পাবলিক অ্যাডভোকেট মেহেরুন নেসা (মনি) স্বাক্ষর ও সিলমোহর দিয়েছেন।

পরবর্তীতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরে মোহাম্মদ হীরক দ্বিতীয় স্ত্রী রুমীর সঙ্গে কিছুদিন সংসার করার পর প্রথম স্ত্রীর কাছে ফিরে যান এবং দ্বিতীয় স্ত্রীকে অস্বীকার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে রুমী আদালতের দ্বারস্থ হন। বর্তমানে এ ঘটনায় আমলী আদালতে দায়ের করা সি.আর. মামলা নম্বর ৬৯৪/২৬ বিচারাধীন।

সম্প্রতি মেহেরপুরে এক চীনা নাগরিক ও স্থানীয় এক তরুণীর বিয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে। ওই দম্পতির উপস্থাপিত হলফনামায় ব্যবহৃত একজন আইনজীবীর সিল ও স্বাক্ষর ভুয়া বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবী। পাশাপাশি বিদেশি নাগরিককে বিয়ের ক্ষেত্রে দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় অনাপত্তিপত্র নেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গাংনী উপজেলার বামুন্দি এলাকাতেও নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রী ও নবম শ্রেণির এক ছাত্র পালিয়ে গিয়ে চক্রটির মাধ্যমে বয়স বাড়িয়ে এফিডেভিট করে। পরে কুষ্টিয়ার প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকেও একটি এফিডেভিট করা হয়। তবে দুজনই নাবালক ছিল। পরে মেয়েটির বাবার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে অভিভাবকদের জিম্মায় দেয়।

গাংনীর এক ভুক্তভোগী অভিভাবক জানান, আইনের বিষয়ে না জানার কারণে অন্যের কথায় বিশ্বাস করে নাবালিকা মেয়ের এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে দিয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, এটিই ‘কোর্ট ম্যারেজ’। প্রায় দেড় বছর পর বিচ্ছেদ হলে তিনি জানতে পারেন, বিয়েটি নিবন্ধিতই হয়নি। ফলে তার মেয়ে দেনমোহর ও খোরপোষ থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। এখন তিনি ন্যায়বিচারের আশায় আদালতে মামলা করছেন।

মেহেরপুরের নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার রিজা আব্দুল মাবুদ বলেন, বিয়ে সম্পাদন বা তার বৈধতা ঘোষণা আইনজীবী কিংবা নোটারি পাবলিকের এখতিয়ার নয়। আইন অনুযায়ী নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রারের মাধ্যমেই বিয়ে সম্পন্ন ও নিবন্ধন করতে হয়। এ ধরনের প্রবণতা ঠেকাতে প্রশাসনের নজরদারি ও জনসচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।

মেহেরপুরের জেলা রেজিস্ট্রার সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো নিবন্ধিত বিবাহের বিধান নেই। একইভাবে বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় ভিডিও কল কিংবা এফিডেভিটের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক সম্পন্ন করারও আইনগত সুযোগ নেই। তাই এসব কর্মকাণ্ডের আইনগত ভিত্তি নেই।

মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল আজম খোকন বলেন, নোটারি পাবলিকের সামনে সশরীরে উপস্থিত না থেকেও এফিডেভিট সম্পাদনের অভিযোগ তাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে আইনজীবী সমিতিতে আলোচনা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মেহেরপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাজওয়ার আকরাম সাকাপি ইবনে সাজ্জাদ বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ এবং নোটারি এফিডেভিটের অপব্যবহার বন্ধে জেলা প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। কোনো অনিয়মের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি কেবল নিবন্ধিত কাজীর মাধ্যমে বিয়ে সম্পাদনের পরামর্শ দেন তিনি।

উল্লেখ্য, মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ (নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৪-এর ৫ ধারা অনুযায়ী প্রতিটি মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন করা বাধ্যতামূলক। বিয়ে নিবন্ধন না করলে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড এবং ৫০০ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

/এএসএফ