• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬ এএম


সদকার শক্তি: গুনাহ মোচন, সম্পদে বরকত ও আখিরাতের সফলতার পথ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৭ আগস্ট ২০২৬ ১:০২ পিএম

মানুষের পার্থিব জীবন অস্থায়ী, কিন্তু আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। সেই চিরন্তন জীবনে মুক্তি ও জান্নাত লাভের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং বরকতময় আমল হলো দান-সদকা। ইসলামে দান-সদকা শুধু অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণের মাধ্যম নয়; বরং এটি দানকারীর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ, গুনাহ মোচন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম উপায়।

গুনাহ মাফ ও জাহান্নাম থেকে সুরক্ষা

হাদিসে দান-সদকার বিশেষ ফজিলতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, পানি যেমন আগুন নিভিয়ে দেয়, তেমনি সদকা মানুষের গুনাহ মুছে দেয়। আন্তরিকভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে দান করলে তা বান্দার জন্য গুনাহ ক্ষমার মাধ্যম হয় এবং জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষাকারী ঢাল হিসেবে কাজ করে। কিয়ামতের দিনও এই সদকা দানকারীর নিরাপত্তার কারণ হবে।

শত্রু ও শাস্তি থেকে মুক্তির উপমা

দান-সদকার গুরুত্ব বোঝাতে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর একটি উপমা বর্ণনা করেছেন। তিনি বনি ইসরাইলকে বলেছিলেন, আল্লাহ তাদের সদকা করার নির্দেশ দিয়েছেন। সদকাকারীর উদাহরণ এমন এক ব্যক্তির মতো, যাকে শত্রুরা বন্দী করে মৃত্যুদণ্ড দিতে নিয়ে যাচ্ছে। তখন সে নিজের সম্পদ দিয়ে মুক্তিপণ দেয় এবং মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পায়। (জামে তিরমিজি)

এই উপমা দ্বারা বোঝানো হয়েছে, গুনাহ মানুষের জন্য শয়তানের বন্দিত্বের মতো। আর সদকা হলো এমন একটি আমল, যা আল্লাহর রহমতে বান্দাকে সেই পরিণতি থেকে মুক্ত করে জান্নাতের পথে এগিয়ে দেয়।

সম্পদে বরকত ও বৃদ্ধি

অনেকের ধারণা, দান করলে সম্পদ কমে যায়। অথচ ইসলামের শিক্ষা সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহানবী (সা.) আল্লাহর নামে শপথ করে বলেছেন, সদকা কখনো সম্পদ কমায় না। বরং আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন এবং সম্পদের কল্যাণ বৃদ্ধি করেন।

পবিত্র কোরআনেও জীবিত থাকতেই দান করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

“তোমাদের কারও মৃত্যু আসার আগে আমি তোমাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে ব্যয় করো। অন্যথায় সে বলবে, ‘হে আমার রব! আমাকে যদি আর অল্প কিছু সময় দেওয়া হতো, তবে আমি দান করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’”
(সুরা আল-মুনাফিকুন, আয়াত: ১০)

মৃত্যুর পরও সওয়াব অব্যাহত থাকে

মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার অধিকাংশ আমলের সুযোগ শেষ হয়ে যায়। তবে কিছু আমলের সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। হাদিস অনুযায়ী, এর মধ্যে অন্যতম হলো সাদকায়ে জারিয়া বা প্রবাহমান দান।

মসজিদ নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, নলকূপ স্থাপন কিংবা জনকল্যাণমূলক কোনো স্থায়ী কাজ—এসব সাদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত। এছাড়া উপকারী জ্ঞান রেখে যাওয়া এবং এমন নেক সন্তান, যে বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করে—এসবের সওয়াবও মৃত্যুর পর অব্যাহত থাকে।

একজন ব্যক্তি সাদকায়ে জারিয়া করে গেলে তার কবরেও সেই নেক আমলের প্রতিদান পৌঁছাতে থাকে, যা আখিরাতে জান্নাত লাভের পথকে সহজ করে।

দান করতে বিলম্ব না করার নির্দেশ

মৃত্যু কখন আসবে, তা কেউ জানে না। তাই ইসলাম জীবিত ও সক্ষম অবস্থায় দান-সদকা করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে। মৃত্যুর সময় অনুশোচনা কোনো কাজে আসে না। বরং সুস্থ ও সামর্থ্যবান অবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করাই একজন মুমিনের প্রজ্ঞার পরিচয়।

সদকা শুধু অর্থ দানেই সীমাবদ্ধ নয়

ইসলামে সদকার ধারণা অত্যন্ত বিস্তৃত। শুধু অর্থ ব্যয় করাই সদকা নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষের প্রতি আন্তরিক হাসিমুখে কথা বলা, উত্তম পরামর্শ দেওয়া, রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা কিংবা মানুষের উপকারে আসে—এমন প্রতিটি ভালো কাজই সদকার অন্তর্ভুক্ত।

তবে আর্থিক দানের ক্ষেত্রে প্রকৃত হকদারদের অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। এতিম, অসহায়, দরিদ্র, বিধবা ও অভাবগ্রস্ত মানুষের প্রয়োজন পূরণে দান করলে দানের প্রকৃত উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হয় এবং সমাজে কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

দান-সদকা কেবল একটি আর্থিক অনুদান নয়; এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, গুনাহ মোচন, বিপদ থেকে সুরক্ষা, সম্পদে বরকত এবং জান্নাতের পথ সুগম করার একটি মহৎ ইবাদত। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান-সদকার অভ্যাস গড়ে তোলা। কারণ দুনিয়ার সম্পদ একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা আন্তরিক দানের প্রতিদান চিরকাল অব্যাহত থাকবে।

/এসএন