ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে তার পিতা ও পূর্বসূরি আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির তুলনায় অনেক বেশি আগ্রহী বলে মনে করছে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন।
যদিও দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে আসছিল যে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জনের চেষ্টা করছে, তবে আলী খামেনি এ বিষয়ে সতর্ক ও দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করতেন।মোজতবা খামেনি প্রকাশ্যে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির আহ্বান জানাননি। তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন অনুযায়ী, তিনি এবং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা বর্তমান কঠোরপন্থী সরকার উন্নত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করে। একই সঙ্গে সরকার হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করার চেষ্টা করছে এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায়ও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধই শেষ পর্যন্ত ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের পথে আরও এগিয়ে দিতে পারে।গোয়েন্দা মূল্যায়নের সীমাবদ্ধতামার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মোজতবা খামেনির অবস্থান সম্পর্কে অধিকাংশ গোয়েন্দা তথ্য যুদ্ধ শুরুর আগের। যুদ্ধের শুরুতে তিনি গুরুতর আহত হন। নিরাপত্তার কারণে এবং বিমান হামলার ঝুঁকি এড়াতে তিনি যোগাযোগ সীমিত করেছেন এবং জনসমক্ষে উপস্থিত হওয়াও প্রায় বন্ধ রেখেছেন। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, তিনি বর্তমানে সরকারের নেতৃত্বে থাকলেও তার পিতার মতো সর্বময় ক্ষমতা ও প্রভাব এখনো অর্জন করেননি।
আলী খামেনি টানা ৩৬ বছরের বেশি সময় ইরান শাসন করেছিলেন।এদিকে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা যদি সত্যিই পারমাণবিক বোমা তৈরির দিকে ঝুঁকে থাকেন, তবে তা সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, তেহরান এখনো পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় চালুর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। যদিও গত বছরের মার্কিন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর সম্পদ রক্ষায় ইরান বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে।
পাহাড়ের গভীরে সরানো হয়েছে স্থাপনামার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরান অন্তত কিছু সেন্ট্রিফিউজ দেশের মধ্যাঞ্চলের পাহাড়ের গভীরে অবস্থিত একটি গোপন স্থাপনায় সরিয়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই স্থাপনাটিকে ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ নামে উল্লেখ করে।তাদের ধারণা, আপাতত ইরানের লক্ষ্য হচ্ছে যন্ত্রপাতিগুলোকে মার্কিন বোমার আঘাতের বাইরে রাখা। গত বছরের জুনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেন। ফোরদো ও নাতাঞ্জে বি-২ স্টেলথ বোমারু বিমান থেকে শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করা হয় এবং ইসফাহানের স্থাপনায় টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা চালানো হয়।হামলার পর ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, স্থাপনাগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তবে প্রাথমিক মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়নে দেখা যায়, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি মাত্র কয়েক মাসের জন্য ব্যাহত হয়েছে।সে সময় ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’ স্থাপনাটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এটি পাহাড়ের অনেক গভীরে অবস্থিত হওয়ায় প্রচলিত শক্তিশালী বোমা দিয়েও সেখানে পৌঁছানো কঠিন। ফোরদোতে হামলার পর ইরান মার্কিন অস্ত্রের সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছে এবং এখন তাদের বিশ্বাস, আরও গভীরে অবস্থিত এই স্থাপনাটি আকাশপথের হামলা থেকে তুলনামূলক নিরাপদ।
তবে ইরান আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্র স্থলপথে কমান্ডো অভিযান চালিয়ে স্থাপনাটি ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারে। সে কারণে সেখানে অতিরিক্ত সেনা মোতায়েন করা হয়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।এ সপ্তাহে ট্রাম্প ওই স্থাপনায় হামলার হুমকিও দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সেখানে বর্তমানে কোনো কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। কর্মকর্তাদের মতে, এর অর্থ হলো ইরান সরঞ্জাম সরিয়ে নিলেও এখনো সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা অন্য কোনো পারমাণবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু করেনি। সম্ভাব্য হামলা নিয়ে পরিকল্পনা বা ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে মার্কিন কর্মকর্তারা কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রতিরোধের কৌশল হিসেবে পারমাণবিক অস্ত্রমার্কিন হামলায় কর্মসূচি সাময়িকভাবে ব্যাহত হলেও, পারমাণবিক বোমার প্রধান উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এখনো ইরানের কাছে রয়েছে।২০০৫ সালে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থাকে (আইএইএ) জানিয়েছিলেন, ধর্মীয় ফতোয়া অনুযায়ী ইরান পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না। তবে সেই ফতোয়া পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জন বা কর্মসূচি পরিচালনার ওপর পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা যুদ্ধের আগে বিভিন্ন কথোপকথন ও প্রকাশ্য বক্তব্য বিশ্লেষণ করে ধারণা করেছেন, মোজতবা খামেনি তার পিতার মতো দ্বিধাগ্রস্ত নন।
বাইডেন প্রশাসনের শেষদিকে তাদের মূল্যায়ন ছিল, ইরান তুলনামূলক সাধারণ মানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথ খুঁজছে, যা হিরোশিমায় ব্যবহৃত বোমার ধরনের হতে পারে। তবে বর্তমান মূল্যায়নে ধারণা করা হচ্ছে, মোজতবা খামেনি আরও উন্নত, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রে বহনযোগ্য থার্মোনিউক্লিয়ার ওয়ারহেড তৈরির বিষয়ে বেশি আগ্রহী।যদিও তিনি প্রকাশ্যে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধরে রাখার কথা বলেছেন, সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে বক্তব্য দেননি।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা স্মারক থেকেও তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন। তার ভাষ্য ছিল, তিনি চুক্তির অনুমতি দিলেও নীতিগতভাবে এর সঙ্গে একমত নন।প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক রোজমেরি কেলানিকের মতে, সৌদি আরবকে সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা গড়ে তুলতে সহায়তার ঘোষণা এবং চলমান যুদ্ধ ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে আরও ঠেলে দিতে পারে।
তার ভাষায়, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা প্রতিরোধের উপায় হিসেবে তেহরান এখন পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনে আগের তুলনায় বেশি আগ্রহী হতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত লক্ষ্যকেই ব্যর্থ করে দিতে পারে।মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের ভেতরে যারা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে কেবল পারমাণবিক অস্ত্রই বিদেশি হামলা প্রতিরোধ করতে সক্ষম, যুদ্ধের পর তাদের অবস্থান এখন আরও শক্তিশালী হয়েছে।
/বিএসএস