দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একের পর এক অনিয়মের তথ্য উঠে আসছে। সর্বশেষ রাজধানীর মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজ, ঢাকা সিটি কলেজ এবং নরসিংদীর মনোহরদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় ১০ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)।
ডিআইএর তদন্তে দেখা গেছে, মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে ৫ কোটি ১০ লাখ ৭৮ হাজার টাকা, ঢাকা সিটি কলেজে ৪ কোটি টাকা এবং আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসায় ১ কোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। একই সঙ্গে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, ঢাকা সিটি কলেজের ১০৫ জন শিক্ষক এবং আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার পাঁচ শিক্ষকের নিয়োগকে অবৈধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, তিনটি প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতা ছাড়াই এমপিও প্রদান, নিয়োগবিধি লঙ্ঘন, ক্যাশবইয়ে লাখ লাখ টাকার লেনদেনের হিসাব না রাখা, অনিয়মের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ, জাল সনদ ব্যবহার, বিধিবহির্ভূতভাবে বেতন-ভাতা গ্রহণ, সরকারি রাজস্ব জমা না দেওয়া, ব্যাংকিং বিধি অনুসরণ না করে নগদ অর্থ ব্যয়, সিটি অ্যালাউন্স গ্রহণ, অতিরিক্ত ভর্তি এবং অনলাইন ফি আদায়সহ আর্থিক ব্যবস্থাপনায় নানা অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে।
ডিআইএ অনিয়মের মাধ্যমে আদায় বা ব্যয় হওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত জমা দেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। সম্প্রতি সংস্থাটি তিনটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। এ বিষয়ে ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা (ডিআইএ) প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তিনটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছি। সেখান থেকে বিধি ও নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
তদন্তে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ও সেশন ফি সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা হলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৭ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমানে কলেজটিতে উচ্চ মাধ্যমিক, স্নাতক (পাস), স্নাতক (সম্মান) এবং প্রফেশনাল বিবিএসহ প্রায় ৮ হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এর মধ্যে একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থী। তদন্ত অনুযায়ী, আট বছর ধরে প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অতিরিক্ত ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩ কোটি টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষ মো. আমিনুল হকের নিয়োগকে বিধিসম্মত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়ে তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেও তার অভিজ্ঞতার সনদ যাচাইয়ে গুরুতর অসঙ্গতি ধরা পড়ে।
তদন্তে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৯৯৮ সালের ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত একই সময়ে তিনি ময়মনসিংহের ফুলপুর ডিগ্রি কলেজ এবং ঢাকার মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজ—উভয় প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন এবং দুই প্রতিষ্ঠান থেকেই বেতন ও অন্যান্য সুবিধা গ্রহণ করেন। সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী একই সময়ে দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করা বেআইনি। এছাড়া পরবর্তী কর্মস্থলে যোগদানের সময় প্রয়োজনীয় ছাড়পত্রও তিনি দাখিল করেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ কারণে তার আবেদন শুরু থেকেই বাতিলযোগ্য ছিল এবং তাকে অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া বিধিবহির্ভূত হয়েছে বলে তদন্ত দল মত দিয়েছে।
এ বিষয়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে মোহাম্মদপুর মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, তিনি সাত বছর ভাইস প্রিন্সিপাল থাকার পর অধ্যক্ষ হয়েছেন এবং তার নিয়োগে কোনো অনিয়ম হয়নি। তিনি ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে লিখিত জবাব দেবেন বলেও জানান।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরীক্ষার সম্মানী ও বিভিন্ন খাতের অন্তত ১২ লাখ ৭৮ হাজার টাকা কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। এছাড়া এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বিধিবহির্ভূতভাবে প্রায় ১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা অতিরিক্ত বেতন দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
উন্নয়ন প্রকল্প, কেনাকাটা এবং ভ্যাট-সংক্রান্ত লেনদেনে প্রয়োজনীয় কর কর্তন না করায় সরকারের আরও উল্লেখযোগ্য রাজস্ব ক্ষতির তথ্য উঠে এসেছে। এসব অর্থ দ্রুত সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত দল।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে কেনা কলেজের মাইক্রোবাসটি দীর্ঘ সাত বছর কোনো লগবই ছাড়াই ব্যবহার করা হয়েছে। এই সময়ে জ্বালানি ও সার্ভিসিং বাবদ প্রায় ১৫ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ের হিসাব দেখানো হলেও গাড়ির ব্যবহারসংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়নি।
ডিআইএর পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা সিটি কলেজে বিভিন্ন সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১৯৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০৫ জনের নিয়োগে অনিয়ম হয়েছে। এদের মধ্যে অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, প্রভাষক ও ডেমোনস্ট্রেটর রয়েছেন।
ডিআইএর অডিট কর্মকর্তা চন্দন কুমার দেব এবং সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মনিরুজ্জামানের স্বাক্ষরিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে শুধু পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও সাক্ষাৎকার নিয়েই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নিয়োগ বোর্ডে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না। এছাড়া নিয়োগ কমিটি গঠন এবং গভর্নিং বডির অনুমোদনের প্রয়োজনীয় নথিও প্রতিষ্ঠানটি দেখাতে পারেনি। ফলে এসব নিয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ডিআইএ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২-১৩ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছরের মধ্যে প্রায় ৭২ লাখ ৭৭ হাজার ২২৯ টাকা ব্যাংকে জমা না দিয়ে নগদে ব্যয় করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি কাজ ও বিভিন্ন পণ্য ক্রয়ে উৎসে ভ্যাট কর্তন না করায় সরকারের ২৮ লাখ ৩২ হাজার ৬৯২ টাকা রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া পাবলিক পরীক্ষার সম্মানীর বিপরীতে উৎসে আয়কর বাবদ ২ লাখ ৯২ হাজার ৬৭ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিধিবহির্ভূতভাবে গভর্নিং বডির সদস্যরা সিটিং অ্যালাউন্স হিসেবে ১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৪ হাজার ৮৩০ টাকা গ্রহণ করেছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিয়ে ট্রেজারি চালানের কপি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
নরসিংদীর মনোহরদীর আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসাতেও নিয়োগ ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত গুরুতর অনিয়মের তথ্য পেয়েছে ডিআইএ। তদন্তে নিয়োগবিধি লঙ্ঘন, জাল শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ব্যবহার, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই নিয়োগ এবং সরকারি বেতন-ভাতা অবৈধভাবে গ্রহণের তথ্য উঠে এসেছে।
এনটিআরসিএ যাচাই করে জানিয়েছে, জুনিয়র শিক্ষক শামসুন্নাহার এবং জুনিয়র মৌলভী মানসুরা আক্তারের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল। তাদের রোল নম্বর উত্তীর্ণদের তালিকায় নেই। এ কারণে শামসুন্নাহারের নেওয়া ১১ লাখ ২১ হাজার ১০০ টাকা এবং মানসুরা আক্তারের ১ লাখ ৯১ হাজার ৯০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া সহকারী শিক্ষক মো. আবদুর রাজ্জাক, সহকারী শিক্ষক (বাংলা) আছমা বেগম এবং সহকারী গ্রন্থাগারিক নেছার উদ্দীন আহমেদের নিয়োগও অবৈধ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে সাত শিক্ষক-কর্মচারীর কাছ থেকে ৮৬ লাখ ৩৩ হাজার টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে।
তদন্তে আরও বলা হয়েছে, ব্যয়ের বিপরীতে কর্তনযোগ্য ২১ হাজার ৭০৮ টাকা ভ্যাট এবং ৭ হাজার ১০২ টাকা আয়কর সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়নি। বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারিত ফির চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরীক্ষা ও রেজিস্ট্রেশন ফি হিসেবে আদায় করা হয়েছে। এছাড়া অর্থ ও ক্রয় উপকমিটি, অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিটি, বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা ও বাজেট প্রণয়নসহ আর্থিক ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ বিধান অনুসরণ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, মাদ্রাসাটির ১ দশমিক ৮২ একর জমি বেহাত হয়েছে। কীভাবে জমিটি বেহাত হয়েছে এবং কারা এর জন্য দায়ী, সে বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে জবাব চাওয়া হয়েছে। তবে এ বিষয়ে জানতে আছাদনগর ফাজিল মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ জবিরুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্রসঙ্গত, গত চার মাসে রাজধানীর মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ প্রায় ২০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরেজমিন তদন্ত চালিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে ডিআইএ। এর মধ্যে প্রায় ১০টি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।
/এসএন