অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও পরিবারের অনুপ্রেরণায় ৫২ বছর বয়সে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন নীলফামারীর শেফালী বেগম। সংসার ও সন্তানের দায়িত্ব সামলে এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.২১ পেয়েছেন তিনি। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কালিগঞ্জ গ্রামের এই নারীর সাফল্য এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প।
শেফালী বেগম জানিয়েছেন, নিজের মনোবল, স্বামী ও সন্তানের উৎসাহ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তিই তাঁর এই সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
মাত্র দেড় বছর বয়সে ফুফাতো ভাই মোকছেদুল আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় শেফালীর। ১৯৮৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বামীর বাড়িতে চলে আসার পর বন্ধ হয়ে যায় তাঁর পড়াশোনা। তবে সংসার, সন্তান ও পারিবারিক দায়িত্বের ব্যস্ততার মধ্যেও শিক্ষার স্বপ্ন কখনো ছেড়ে দেননি তিনি।
সংসার ও সন্তানদের দেখাশোনার পাশাপাশি ২০১১ সালে ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচিত হন শেফালী। টানা দুই মেয়াদে ২০১১ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত এ পদে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
২০২০ সালে স্বামী ও ছেলের উৎসাহে আবারও বই হাতে তুলে নেন শেফালী বেগম। ভর্তি হন ডোমার উপজেলার গোমনাতি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজে। এরপর ২০২৩ সালে জিপিএ ৪.২৯ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এবার একই ধারাবাহিকতায় এইচএসসি পরীক্ষাতেও সাফল্য অর্জন করেছেন তিনি।
শেফালী বেগম বলেন, সংসারের দায়িত্ব সামলে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন ছিল। তবে প্রতিদিনের পরিশ্রম ও ধৈর্য তাঁকে আজকের অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে। সংসারের সব কাজ শেষ করে রাত ৯টার পর পড়তে বসতেন তিনি। কোনো প্রাইভেট শিক্ষক না থাকায় অনেক সময় ছেলে-মেয়েদের কাছ থেকে ইংরেজি শিখেছেন। পড়তে পড়তে কখন রাত ১টা বা ২টা বেজে যেত, তা বুঝতেও পারতেন না।
নিজের শিক্ষাজীবনের স্বপ্নের কথা জানিয়ে শেফালী বলেন, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের খুব ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় স্বামীর বাড়িতে চলে আসতে হওয়ায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সংসার ও সন্তানদের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হয়েছে। সন্তানদের সফলতাই তাঁকে নতুন করে পড়াশোনায় ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছে।
তিনি বলেন, “এই বয়সে এসে অনেকে পারবে কিনা জানি না, কিন্তু ইনশাআল্লাহ আমি পেরেছি। বয়স শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। আমি সামনে পড়াশোনা চালিয়ে যাব, এবার অনার্সে ভর্তি হব।”
শেফালীর স্বামী মোকছেদুল আলম বলেন, তাঁরা সবসময় শেফালীর পাশে থেকেছেন। ভালো ফলাফলের চাপ না দিয়ে শুধু পাস করে আসার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সংসারের দৈনন্দিন কাজে সহযোগিতা করেছেন, যাতে তিনি পড়াশোনার জন্য সময় পান। তাঁর মতে, পড়াশোনা চালিয়ে গেলে সমাজের জন্যও কিছু করা সম্ভব।
শেফালীর বড় ছেলে আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মায়ের সাফল্যে তিনি ভীষণ আনন্দিত। এমন একজন সফল মায়ের সন্তান হতে পেরে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন তিনি। এই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও জানান আব্দুর রাজ্জাক।
/এএসএফ