রাজবাড়ীর কালুখালীর মালিয়াট গ্রামের বিশু রবিদাসের জীবন যেন সংগ্রাম আর বাস্তবতার এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। দারিদ্র্যকে পেছনে ফেলে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছিলেন তিনি। বিএ ডিগ্রি শেষে একটি সরকারি দপ্তরে চাকরিও পেয়েছিলেন। পরিবারের বিশ্বাস ছিল, এবার হয়তো বদলে যাবে তাদের ভাগ্য।কিন্তু সেই স্বপ্ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।পরিবারের দাবি, জাতিগত পরিচয় জানাজানি হওয়ার পর কর্মস্থলে নানা ধরনের অবহেলা ও বৈষম্যের শিকার হন বিশু রবিদাস।
একসময় অসুস্থ এক আত্মীয়কে দেখতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মৌখিক অনুমতি নিয়ে বাড়িতে যান। পরে কর্মস্থলে ফিরে এসে জানতে পারেন, অনুপস্থিতির কারণ দেখিয়ে তার চাকরি বাতিল করা হয়েছে।একটি চাকরি হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় বহু বছরের লালিত স্বপ্নও।এরপর আর সরকারি চাকরিতে ফেরা হয়নি।
সংসারের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন পূর্বপুরুষের পেশায়। হাতে তুলে নেন জুতা সেলাইয়ের সুঁই, সুতা ও হাতুড়ি।গত প্রায় ৪৫ বছর ধরে রাজবাড়ীর কালুখালী রেলস্টেশনের পাশে ছোট্ট একটি দোকানে বসে মানুষের ছেঁড়া জুতা মেরামত করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি।
যে হাত একসময় সরকারি নথিপত্র সামলাত, আজ সেই হাতই জুতা সেলাই করে পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করছে।বয়সের ভারে শরীর আগের মতো সাড়া দেয় না। বিভিন্ন রোগও বাসা বেঁধেছে শরীরে। তারপরও থেমে নেই তার কর্মজীবন। কারণ এই ছোট্ট দোকানই এখন পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস।বিশু রবিদাসের জীবন কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি সমাজের বৈষম্য, আত্মমর্যাদা ও কঠিন বাস্তবতারও এক নীরব দলিল।
তার গল্প মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা মানুষের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিলেও জীবনের বাস্তবতা অনেক সময় সেই পথকে কঠিন করে তোলে।মানুষকে তার পেশা দিয়ে নয়, সততা, পরিশ্রম ও মানবিকতা দিয়ে মূল্যায়ন করাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। কারণ প্রতিটি মানুষের জীবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অজানা সংগ্রামের একেকটি গল্প।
/বিএসএস