গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে মুসলিম-আমেরিকানদের উপস্থিতি ও প্রভাব ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। একসময় স্থানীয় সরকার ও স্কুল বোর্ডের নির্বাচনে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে মুসলিম প্রার্থীরা সিটি কাউন্সিল, অঙ্গরাজ্যের আইনসভা, কংগ্রেস এবং বড় শহরের নির্বাহী নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করছেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক মুসলিম প্রার্থীর বিজয় এবং নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির নির্বাচিত হওয়ার পর বিষয়টি আবারও জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে।
মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এবং এর রাজনৈতিক শাখা সিএআইআর অ্যাকশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নির্বাচনে অন্তত ৭৬ জন মুসলিম-আমেরিকান বিভিন্ন পদে প্রার্থী হন। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৮ জন নির্বাচিত হন, যা সংগঠনটির মতে যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ইতিহাসে অন্যতম বড় সাফল্য। পরবর্তীতে আরও কয়েকটি নির্বাচনের ফল যুক্ত হওয়ায় নির্বাচিত প্রতিনিধির সংখ্যা আরও বেড়েছে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির বিজয়। তিনি শহরটির প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত মেয়র। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিজয় শুধু একটি শহরের নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়, বরং মূলধারার মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিম-আমেরিকানদের ক্রমবর্ধমান গ্রহণযোগ্যতারও প্রতীক।
একই নির্বাচনী চক্রে ভার্জিনিয়ায় গাজালা হাশমি রাজ্যব্যাপী নির্বাচিত প্রথম মুসলিম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়েন। এছাড়া মিশিগান, মিনেসোটা, নিউ জার্সি, মেরিল্যান্ড, টেক্সাস, ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়াসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে মুসলিম প্রার্থীরা স্থানীয় ও অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচিত হয়েছেন।
মার্কিন কংগ্রেসেও ধীরে ধীরে বাড়ছে মুসলিমদের প্রতিনিধিত্ব। ২০০৬ সালে মিনেসোটা থেকে কিথ এলিসন প্রথম মুসলিম হিসেবে প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন। পরে আন্দ্রে কারসন, ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব এবং সর্বশেষ ক্যালিফোর্নিয়া থেকে লেটিফাহ সাইমন কংগ্রেসে যোগ দেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদে চারজন মুসলিম সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে কোনো মুসলিম সদস্য নির্বাচিত হননি।
স্থানীয় পর্যায়েও মুসলিম জনপ্রতিনিধির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সিএআইআর ও জেটপ্যাকের যৌথ জাতীয় ডিরেক্টরি অনুযায়ী, বর্তমানে ৩০টির বেশি অঙ্গরাজ্যে দুই শতাধিক মুসলিম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ও বিচারক দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মেয়র, সিটি কাউন্সিল সদস্য, স্কুল বোর্ড সদস্য, কাউন্টি কমিশনার, অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতা এবং বিচারক।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। গত দুই দশকে মুসলিম অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্ম উচ্চশিক্ষা, আইন, চিকিৎসা, ব্যবসা এবং জনসেবামূলক পেশায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন ভোটার নিবন্ধন, নেতৃত্ব বিকাশ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব তৈরির পাশাপাশি বড় রাজনৈতিক পদেও মুসলিম প্রার্থীদের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের মোট জনসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও মিশিগান, মিনেসোটা, নিউইয়র্ক, নিউ জার্সি, ভার্জিনিয়া ও টেক্সাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে তাদের ভোট নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। একই গবেষণায় দেখা গেছে, মুসলিম ভোটারদের রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় আরও বৈচিত্র্যময় হয়েছে। যদিও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রতি সমর্থন তুলনামূলক বেশি, তবে রিপাবলিকান পার্টির প্রতিও সমর্থন বাড়ছে।
গাজা যুদ্ধ, অভিবাসন নীতি, অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার এবং বৈদেশিক নীতির মতো বিভিন্ন ইস্যুতে মুসলিম ভোটারদের অবস্থান সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এ কারণে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলই মুসলিম ভোটারদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল আরও জোরদার করেছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
অন্যদিকে মুসলিমদের রাজনৈতিক উত্থানকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিবিএন নিউজের এক প্রতিবেদনে কিছু রক্ষণশীল বিশ্লেষক মুসলিম রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিকে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পাশাপাশি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জোহরান মামদানির নির্বাচনী বিজয়ের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলামবিদ্বেষী পোস্টের সংখ্যা বেড়েছে বলে মুসলিম অধিকারবিষয়ক সংগঠনগুলো দাবি করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের রাজনৈতিক উত্থান শুধু একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং এটি দেশটির জনসংখ্যাগত বৈচিত্র্য, নাগরিক অংশগ্রহণ এবং মূলধারার রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বের বিকাশেরও প্রতিফলন।
সূত্র: সিএআইআর, পিউ রিসার্চ সেন্টার, রয়টার্স, সিবিএন নিউজ
/এএসএফ