বর্তমান সময়ে বাবা-মায়েদের কাছে সন্তানের ছবি বা ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করা যেন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। ডায়াপার বদলানোর মুহূর্ত থেকে শুরু করে পটি-ট্রেনিং কিংবা ব্যক্তিগত শারীরিক পরিবর্তনের মতো বিষয়ও প্রকাশ পাচ্ছে শত শত, কখনো হাজারো মানুষের সামনে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ‘অতি-শেয়ারিং’ ভবিষ্যতে শিশুদের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
একসময় শিশুদের বিব্রতকর মুহূর্তগুলো পারিবারিক অ্যালবামেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু এখন সেগুলো স্থায়ীভাবে থেকে যাচ্ছে ইন্টারনেটে—যা পরবর্তীতে একজন মানুষের ডিজিটাল পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠতে পারে।
অনেক ক্ষেত্রেই শিশুরা বড় হয়ে এমন একটি অনলাইন পরিচয় বহন করছে, যা তারা নিজেরা তৈরি করেনি এবং মুছে ফেলার ক্ষমতাও তাদের নেই।
২৪ বছর বয়সী কেমি ব্যারেট ছোটবেলায় তার মায়ের অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের শিকার হন। তার ব্যক্তিগত মুহূর্ত—রোগ, দুর্ঘটনা, এমনকি দত্তক হওয়ার তথ্যও প্রকাশ্যে শেয়ার করা হয়েছিল।
এর ফলে তিনি সহপাঠীদের কাছ থেকে হয়রানির শিকার হন এবং একপর্যায়ে স্কুলও পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। এমনকি বর্তমানে তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও আস্থাহীনতায় ভোগেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের শিশুরা খুব অল্প বয়সেই ‘ডিজিটাল ম্যাচিউরিটি’ অর্জন করছে। ১০-১২ বছর বয়সী অনেক শিশুই এখন তাদের বাবা-মাকে প্রশ্ন করছে—কেন তাদের ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলো অনলাইনে শেয়ার করা হয়েছে।
কিশোর-কিশোরীরাও এখন অতিরিক্ত শেয়ারিং নিয়ে সতর্ক এবং এটিকে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে শিশুদের অনলাইন গোপনীয়তা রক্ষায় সুস্পষ্ট আইন এখনো সীমিত। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত চরম অনুপযুক্ত কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ করে, কিন্তু সাধারণ ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে তেমন বাধা নেই।
অন্যদিকে, ফ্যামিলি ভ্লগিং ও কনটেন্ট তৈরি থেকে অনেক পরিবার আয় করছে, যেখানে শিশুদের অংশগ্রহণ থাকলেও সেই আয়ের ওপর তাদের কোনো আইনি অধিকার নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লাইক, কমেন্ট ও ভিউ বাবা-মায়েদের জন্য একধরনের মানসিক পুরস্কার হিসেবে কাজ করে। সন্তানদের নিয়ে পোস্ট করা তাদের কাছে স্বীকৃতি পাওয়ার একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

কিছু সচেতন বাবা-মা ইতোমধ্যে সন্তানদের গোপনীয়তা রক্ষায় পদক্ষেপ নিচ্ছেন—ছবি পোস্ট না করা, কিংবা মুখ ঢেকে দেওয়া। তবে বাস্তবতা হলো, এখন প্রায় সবার হাতেই ক্যামেরা থাকায় সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রাখা কঠিন।
ডিজিটাল যুগে বড় হওয়া এই প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো—নিজেদের অজান্তে তৈরি হয়ে যাওয়া একটি অনলাইন পরিচয়।
তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানের কোনো কিছু অনলাইনে শেয়ার করার আগে একবার ভেবে নেওয়া জরুরি—এটি ভবিষ্যতে তার জন্য সমস্যা তৈরি করবে কি না।
সূত্রঃ দা আটলান্টিক