২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের বহুল প্রতীক্ষিত ফাইনালে আজ রাত ১টায় মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও স্পেন। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর দৃষ্টি যখন এই মহারণে, তখন গাজা উপত্যকার অধিকাংশ সমর্থকের পছন্দ স্পষ্ট—তারা সমর্থন দিচ্ছেন স্পেনকে।গাজাবাসীর মতে, ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে স্প্যানিশ সরকারের অবস্থান এবং স্পেনের ক্রীড়াবিদদের প্রকাশ্য সংহতিই তাদের এই সমর্থনের প্রধান কারণ।
বিশেষ করে স্পেনের তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামালের ফিলিস্তিনপ্রীতি গাজার মানুষের কাছে গভীরভাবে প্রশংসিত হয়েছে।গাজার ৩৩ বছর বয়সী বাসিন্দা আহমেদ আল-বোজম বলেন, “আমি পুরোপুরি স্পেনের পক্ষে, কারণ তারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে।” ইয়ামালের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, “ফিলিস্তিন থেকে আমরা তোমাকে ভালোবাসি।”গত মে মাসে বার্সেলোনার লা লিগা শিরোপা উদযাপনের সময় ইয়ামাল ফিলিস্তিনের পতাকা বহন করেছিলেন।
সেই ঘটনার কথা উল্লেখ করে আল-বোজম আশা প্রকাশ করেন, স্পেন এবার বিশ্বকাপ জিতে বিশ্বমঞ্চেও ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরবে।তবে গাজায় যুদ্ধের বাস্তবতায় বিশ্বকাপ উপভোগ করাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের কারণে বিদ্যুৎ সংকট ও জ্বালানির অভাবে অনেকেই টেলিভিশনে ম্যাচ দেখার সুযোগ পান না।সাবেক ফুটবলার ও স্টেডিয়াম ম্যানেজার আদনান আল-আফিফি জানান, বিদ্যুৎ থাকলেই কেবল ম্যাচ দেখা সম্ভব হয়। কিন্তু জেনারেটর চালানোর মতো জ্বালানিও অনেক সময় পাওয়া যায় না।
এর মধ্যেই গাজার ফুটবলপ্রেমীদের কিছুটা আনন্দ দিতে গাজা সিটির বর্তমানে সচল থাকা একমাত্র ক্লাব ‘প্যালেস্টাইন স্পোর্টস ক্লাব’-এ একটি প্রতীকী বিশ্বকাপ আয়োজন করেন আল-আফিফি। গত বৃহস্পতিবার ও শনিবার সেখানে ফিলিস্তিন ও স্পেনের জার্সি পরে দুটি দল প্রদর্শনী ম্যাচে অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচের আবহ তৈরি করতে রেফারির পাশাপাশি প্রতীকী ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল।৩৭ বছর বয়সী আল-আফিফি বলেন, “পুরো পরিবেশ ছিল আবেগ ও ইতিবাচকতায় ভরপুর। এটি ছিল স্প্যানিশ দলের প্রতি আমাদের সমর্থনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ।”
২০২৪ সালের মে মাসে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেন এবং গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। একই সঙ্গে লামিনে ইয়ামাল ও সাবেক ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গুয়ার্দিওলার মতো স্প্যানিশ ক্রীড়া ব্যক্তিত্বদের অবস্থানও গাজাবাসীর কাছে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।গাজার যুদ্ধাহত ও অঙ্গ হারানো ফুটবল দল ‘গাজা আল-ইরাদা’র প্রধান কোচ হাতেম আল-মাগরিবী বলেন, “আমাদের খেলোয়াড়রা শরীরের অঙ্গ হারিয়েছে, কিন্তু যারা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়েছে তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার ইচ্ছা হারায়নি।” একই সঙ্গে তিনি ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানানো মিশরের কোচ হোসাম হাসানকেও ধন্যবাদ জানান।
যুদ্ধের কারণে রাফাহ থেকে বাইত হানুন পর্যন্ত গাজার বড় বড় স্টেডিয়াম হয় ধ্বংস হয়ে গেছে, নয়তো বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। ফলে এখন ফুটবল সীমাবদ্ধ ছোট ছোট ফাইভ-এ-সাইড মাঠে। তবুও এই খেলাই গাজার মানুষের জন্য অন্তত ৯০ মিনিটের জন্য যুদ্ধের বিভীষিকা ভুলে থাকার একমাত্র আশ্রয় হয়ে উঠেছে।অন্যদিকে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইর ইসরায়েল-সমর্থক অবস্থানের কারণে গাজাবাসীর মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা অটুট রয়েছে।
আল-আফিফি বলেন, “স্পেনকে সমর্থন করার অর্থ এই নয় যে আমরা আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে। আর্জেন্টিনা অসাধারণ একটি ফুটবল দেশ এবং প্রতিভার ভাণ্ডার। তাদের জন্যও আমাদের শুভকামনা রয়েছে।”কোচ হাতেম আল-মাগরিবীর মতে, লিওনেল মেসির উপস্থিতি আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখবে। তবে আহমেদ আল-বোজমের বিশ্বাস, নির্ধারিত সময়ে ১-১ সমতার পর অতিরিক্ত সময়ে আরও দুটি গোল করে স্পেন ৩-১ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবে।
সূত্র: আল জাজিরা
/বিএসএস