• ঢাকা
  • রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:২১ পিএম


কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে অসাধু চক্র

উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে যেতে গিয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবার

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৩১ জুলাই ২০২৬ ৯:৪৪ এএম

দেশে বেকারত্ব, সীমিত কর্মসংস্থান এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ থেকে মুক্তির আশায় প্রতিবছর হাজারো তরুণ বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কেউ ওয়ার্কার ভিসায়, কেউ শিক্ষার্থী হিসেবে ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। এদের বড় একটি অংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। পরিবারের একজনকে বিদেশে পাঠানোর আশায় অনেকেই জমিজমা বিক্রি করছেন, সঞ্চয় ভেঙে ফেলছেন কিংবা ঋণের বোঝা কাঁধে নিচ্ছেন। কিন্তু উন্নত জীবনের সেই স্বপ্ন অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হচ্ছে দুঃস্বপ্নে।

বিদেশে পাঠানোর নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সি ও কনসালট্যান্সি প্রতিষ্ঠানের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। ওয়ার্ক পারমিটের নামে টুরিস্ট ভিসা, জাল ই-ভিসা, ভুয়া চাকরির অফার এবং অস্তিত্বহীন নিয়োগপত্র দিয়ে তারা প্রতারণা করছে। এর ফলে কেউ বিমানবন্দর থেকেই ফিরে আসছেন, আবার কেউ বিদেশের অন্য দেশে গিয়ে আটকা পড়ছেন। টাকা ফেরত চাইলে ভুক্তভোগীদের হুমকির মুখেও পড়তে হচ্ছে।

ঢাকার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া এমন ১৫টি প্রতারণার মামলা বিশ্লেষণ করেছে যুগান্তর। মামলার এজাহার, তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিদেশে চাকরি, স্টুডেন্ট ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট এমনকি অনলাইন বিনিয়োগের নামে সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে টার্গেট করছে।

মামলার নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতারকরা প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পরিচিতজন বা দালালের মাধ্যমে আস্থা অর্জন করে। পরে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা আদায় করে। শেষ পর্যন্ত ভুক্তভোগীরা জানতে পারেন, তাদের হাতে দেওয়া ভিসা বা অন্যান্য কাগজপত্র জাল অথবা অকার্যকর।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদেশে যাওয়ার স্বপ্নকে পুঁজি করে প্রতারকচক্র মূলত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু বানায়। কারণ এই শ্রেণির মানুষ পরিবারের ভবিষ্যৎ বদলানোর আশায় শেষ সম্বল বিক্রি করেও একজন সদস্যকে বিদেশে পাঠাতে রাজি হন। সেই আবেগ ও বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই প্রতারকরা ধাপে ধাপে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, বিদেশে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স, ভিসার সত্যতা এবং চাকরিদাতার তথ্য সরকারি মাধ্যমে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো অবস্থাতেই শুধু মৌখিক আশ্বাস বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়ের ভিত্তিতে অর্থ লেনদেন করা উচিত নয়। এসব প্রতারণার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলা বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে।

একই গ্রামের ১৩ জনের স্বপ্ন ভেঙে গেল, হাতিয়ে নেওয়া হলো ৩৮ লাখ টাকা

মোজাম্মেল হক নামের এক ব্যক্তি তার এক বন্ধুর মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচিত হন। ওই প্রতিনিধি ইউরোপে লোক পাঠানোর নিশ্চয়তা দিয়ে তার গ্রামের ১৩ জনকে উজবেকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, সার্বিয়া ও ব্রুনাইয়ে চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পরে বিভিন্ন সময়ে নগদ অর্থ, ব্যাংক হিসাব এবং চেকের মাধ্যমে অভিযুক্তকে মোট ৩৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

কিন্তু উজবেকিস্তানের ওয়ার্ক পারমিট দেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে টুরিস্ট ভিসা দেওয়া হয়। পরে তিনজনকে উজবেকিস্তানে পাঠানোর কথা বলে শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যেখানে তারা আটকা পড়ে যান। অন্যদিকে উজবেকিস্তানে যাওয়া একজনও কোনো চাকরি পাননি। তাদের থাকা-খাওয়া ও দেশে ফিরিয়ে আনতে ভুক্তভোগীকে অতিরিক্ত ৪ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়।

এরপর অস্ট্রেলিয়ার ওয়ার্ক পারমিটের প্রতিশ্রুতি দিলেও দেওয়া হয় টুরিস্ট ভিসা। ওই যাত্রী বিমানবন্দরে পৌঁছালে ইমিগ্রেশন পুলিশ কাগজপত্র যাচাই করে তাকে ফিরিয়ে দেয়। পরে আগের টাকাতেই সার্বিয়ায় পাঁচজনকে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে নতুন ভিসা দেওয়া হয়। কিন্তু অনলাইনে যাচাই করে দেখা যায়, সার্বিয়ার ভিসাগুলোও জাল।

এক কোটির বেশি টাকা নেওয়ার পরও দেওয়া হলো জাল ভিসা

পল্টন থানায় দায়ের করা এক মামলায় মারহাবা ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের স্বত্বাধিকারী মোশাররফ হোসেন অভিযোগ করেন, জেএস ইন্টারন্যাশনাল কনসালটেন্সির দুই প্রতিনিধির সঙ্গে পরিচয়ের পর তারা সার্বিয়া, রাশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব দেন।

সার্বিয়ায় চাকরি, প্রসেসিং, ভ্রমণ এবং দুই বছরের টিআরসি কার্ডসহ জনপ্রতি ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় ১৮ জনকে পাঠানোর চুক্তি হয়। এ জন্য অভিযুক্তদের মোট ১ কোটি ৭ লাখ ৯৮ হাজার ৮০ টাকা দেওয়া হয়। পরে তারা ১৮ জন যাত্রীর জন্য সার্বিয়ার ই-ভিসা ও টিকিট সরবরাহ করে। কিন্তু ২০২৫ সালের ২৫ জুলাই হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর এয়ারলাইন্স কর্তৃপক্ষ যাচাই করে জানায়, ভিসাগুলো জাল।

সৌদি আরবে চাকরির নামে আত্মসাৎ করা হয় ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা

পড়াশোনা না জানা শাসছু মিয়া অভিযোগ করেন, পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে সাহাব উদ্দিনের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে নয়াপল্টনের একটি কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের অফিসে সৌদি আরবে এমপ্লয়মেন্ট ভিসায় পাঠানোর বিষয়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকায় মৌখিক চুক্তি হয়। পরে বিভিন্ন সময়ে তিনি মোট ৫ লাখ ৭০ হাজার টাকা পরিশোধ করেন।

এরপর তাকে একটি ভিসা দেওয়া হলেও যাচাই করে তিনি জানতে পারেন, সেটিও জাল।

/এসএন