• ঢাকা
  • রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪১ পিএম


পদ্মায় ইলিশের আকাল, মাছ ধরা ছেড়ে বিকল্প পেশায় মানিকগঞ্জের জেলেরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৪:৪৫ পিএম

একসময় প্রমত্তা পদ্মায় জাল ফেললেই জেলেদের ডোল ভরে উঠত রুপালি ইলিশে। মৌসুমি হাওয়ার সঙ্গে নদীপাড়ের ঘাটগুলোতে বসত মাছ কেনাবেচার জমজমাট উৎসব। তবে সেই সুদিন এখন অনেকটাই অতীত। পদ্মায় দীর্ঘ সময় ধরে জাল ফেলেও প্রত্যাশিত মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। ফলে ইলিশ ধরে সংসার চালানো পরিবারগুলোর জীবনে দেখা দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা। নৌকা চালানো ও মাছ ধরার খরচের তুলনায় আয় খুবই কম হওয়ায় অনেকে নদী ছেড়ে বিকল্প পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

মানিকগঞ্জের দৌলতপুর, শিবালয় ও হরিরামপুর উপজেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ পদ্মা ও যমুনা নদীর ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে পদ্মার ইলিশ স্থানীয় মৎস্যজীবীদের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল। কিন্তু কয়েক বছর ধরে নদীতে মাছের সংকট দেখা দেওয়ায় সেই জীবিকার প্রধান মাধ্যমই এখন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ‘ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ’-এর তথ্য বিশ্লেষণেও পদ্মা নদীতে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার চিত্র উঠে এসেছে।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২০-২১ অর্থবছরে লোয়ার পদ্মা থেকে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ১ হাজার ১৫৯ মেট্রিক টন। ২০২১-২২ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১ হাজার ১১৭ মেট্রিক টনে। পরের অর্থবছর ২০২২-২৩ সালে সামান্য বেড়ে ইলিশ আহরণ হয় ১ হাজার ১২২ মেট্রিক টন। এরপর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আবার কমে তা দাঁড়ায় ১ হাজার ৯০ মেট্রিক টনে। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইলিশ আহরণে বড় ধরনের পতন ঘটে। ওই অর্থবছরে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ নেমে আসে মাত্র ৬২২ মেট্রিক টনে।

পরিসংখ্যান বলছে, চার বছরের ব্যবধানে লোয়ার পদ্মায় ইলিশ আহরণ কমেছে ৫৩৭ মেট্রিক টন। শতাংশের হিসাবে এই হ্রাস প্রায় ৪৬ দশমিক ৩৩ শতাংশ। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মাত্র এক বছরের ব্যবধানেই ইলিশ আহরণ কমেছে ৪৬৮ মেট্রিক টন।

সরকারি পরিসংখ্যানে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, নদীপাড়ের জেলেদের অভিজ্ঞতাতেও তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। হরিরামপুরের বাহিরচর গ্রামের জেলে ফারুক হোসেন ব্যাপারী বলেন, শুধু মাছ ধরে এখন আর সংসার চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বাধ্য হয়ে মাছ ধরার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতে হচ্ছে তাকে। তার মতে, নদী আগের মতো গভীর না থাকায় মাছও আগের মতো আসছে না।

একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন ভেলাবাদ গ্রামের জেলে লালন মোল্লা। তার ধারণা, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক নৌযান ও জাহাজের শব্দের কারণেও ইলিশ দূরে সরে যাচ্ছে।

অন্যদিকে জীবিকার সংকটে পড়ে মাছ ধরার পেশাই ছেড়ে দিয়েছেন দড়িকান্দি গ্রামের নিবন্ধিত জেলে লিটন। তিনি নৌকা ও জাল বিক্রি করে রিকশা চালানো শুরু করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক ও পরিবেশগত নানা পরিবর্তনের কারণে ইলিশের বিচরণে সংকট তৈরি হয়েছে। সমুদ্র থেকে মিঠাপানিতে ডিম ছাড়ার উদ্দেশ্যে ইলিশ যে পথে আসে, সেই পথে নদীতে পলি জমে ডুবোচর ও চর সৃষ্টি হওয়ায় তাদের চলাচলে বাধা তৈরি হচ্ছে। এ ছাড়া নদীর পানির লবণাক্ততা ও প্রবাহের পরিবর্তন, বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত বর্জ্যের কারণে পানিদূষণ এবং নদীর স্বাভাবিক খাদ্যচক্র নষ্ট হওয়াকেও ইলিশ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন তারা।

এর পাশাপাশি কারেন্ট জাল ও ক্ষতিকর চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহারের ফলে জাটকা ও মা ইলিশ নিধন হচ্ছে। এতে ইলিশের স্বাভাবিক প্রজননচক্রও ব্যাহত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

জেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ইলিশ সুরক্ষায় ২৬২টি অভিযান ও ৭৫টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। এসব অভিযানে ৩ মেট্রিক টন ইলিশ এবং ২ লাখ ২৯ হাজার মিটার অবৈধ জাল জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ১০৯টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭০ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং মোট ২ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।

হরিরামপুর উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নূরুল ইকরাম বলেন, নদীতে চর জেগে ওঠা, জলযান চলাচল, দূষণ এবং অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের বিচরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অবৈধভাবে ইলিশ শিকারকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত রয়েছে।

মানিকগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা শেখ মনিরুল ইসলাম মনির বলেন, নাব্যতা সংকট, দূষণ ও অসচেতনতার কারণে পদ্মা-যমুনায় ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে। তবে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণ সুরক্ষায় সরকারি নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

/এসএন