ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হওয়া জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেতে ফরম সংগ্রহ করেছেন ৭০ জন নারী নেত্রী। তাঁদের মধ্যে সাবেক সংসদ সদস্য, দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেত্রী এবং জেলা ও মহানগর পর্যায়ের সংগঠকেরাও রয়েছেন।
বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে এসব নেত্রী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন।
ফরম সংগ্রহ করা নেত্রীদের অনেকেই বিগত দিনের আন্দোলন-সংগ্রামে নিজেদের ভূমিকা এবং বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে দলীয় মূল্যায়নের প্রত্যাশা করছেন। একই সঙ্গে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে নিজ নিজ এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ করার সুযোগ চান তাঁরা। তবে উপনির্বাচনে আসনটি একটি হওয়ায় বিএনপিকে শেষ পর্যন্ত একজনকেই মনোনয়ন দিতে হবে।
বিএনপির ঘোষিত সময়সূচি অনুযায়ী, শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়। ফরম সংগ্রহ করা নেত্রীদের পূরণ করা আবেদন আজ একই কার্যালয়ে জমা দিতে হবে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ফরম জমা নেওয়া হবে। বিএনপির মনোনয়ন চেয়ে দলীয় কার্যালয়ে আবেদন জমা দেওয়ার পরও নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিলের পৃথক প্রক্রিয়া রয়েছে।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় সাবেক সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেত্রীরা
মিষ্টির শূন্য আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়ার আলোচনায় আগে যেসব নেত্রীর নাম এসেছিল, তাঁদের সবাই ফরম সংগ্রহ করেছেন বলে নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির সহমানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া এবং দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শাহানা আক্তার সানু ও আয়শা সিদ্দিকা মনি।
এ ছাড়া মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন মহিলা দলের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শাহিনুর নার্গিস, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক শাহিনুর বেগম, মহিলা দলের কেন্দ্রীয় মানব উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক খন্দকার ফারহানা আতিকা, বরিশাল মহানগর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক মাসুদা আফরোজ হক।
মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা মহানগর উত্তর মহিলা দলের সভাপতি রুনা লায়লা এবং দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরাও।
প্রবীণ নারী নেত্রী জেলী চৌধুরীও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেরা আলাউদ্দিন হেনা ও সিমকী ইমাম খান মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তালিকায় রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা দলের সাবেক প্রচার সম্পাদক দেওয়ান মাহমুদা আক্তার, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আলোচনায় থাকা সৈয়দা আদিবা হোসেন এবং ইডেন মহিলা কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক রেহানা আক্তার শিরিনসহ অন্য নেত্রীরা।
এর আগে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন চেয়ে তাঁদের অনেকেই দলীয় মনোনয়ন পাননি। আবার কেউ কেউ সরাসরি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মিষ্টির পদত্যাগের পর তাঁদের সামনে নতুন করে সংসদে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ছাত্রদলের রাজনীতি থেকে উঠে আসা নেত্রীদের পাশাপাশি মহিলা দল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সংগঠকেরাও এবার মনোনয়ন চাইছেন।
আন্দোলনে মামলা ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছেন নেত্রীরা
মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা রুনা লায়লা জানান, শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে বিগত সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ২২টি মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর তাঁর মাথায় গুলি লেগেছিল বলেও জানান তিনি।
রুনা লায়লার দাবি, ঢাকা উত্তরের অলিগলি তাঁর পরিচিত। দলের প্রয়োজনে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়া হবে এবং এবার তিনি দলীয় মূল্যায়ন পাবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
দিনাজপুর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসনাহেনা হীরাও আন্দোলন-সংগ্রামে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, আন্দোলনে ভূমিকা রাখার পর এবার নিজ এলাকার উন্নয়নে কাজ করতে চান। এ জন্য সরাসরি সংসদে উপস্থিত থেকে ভূমিকা রাখার সুযোগকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি।
নিজের এলাকার পিছিয়ে থাকার কথা উল্লেখ করে হাসনাহেনা হীরা বলেন, ‘আমার এখন দায়িত্ব পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য কিছু করার। কিন্তু সরকারে সরাসরি না থাকলে সেটা বেশ কঠিন আমার জন্য। এ জন্যই আমি ফরম তুলেছি। আমার বিশ্বাস, দল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে অবশ্যই মূল্যায়ন করবেন।’
মিষ্টির পদত্যাগে শূন্য হয় সংরক্ষিত নারী আসন
এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর মিরপুরের রাড্ডা মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ওঠার পর ১ অক্টোবর সংসদ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগ করেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তাঁর পদত্যাগের দিনই সংরক্ষিত নারী আসন-২৩ শূন্য ঘোষণা করা হয়।
এই আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ নভেম্বর। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ২৬ অক্টোবর। মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে ২৭ অক্টোবর এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ১ নভেম্বর।
আসনটি বিএনপির জন্য বরাদ্দ থাকায় দলটিই এখানে প্রার্থী মনোনয়ন দেবে। একক প্রার্থী থাকলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হবেন। ফলে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করা ৭০ জন নারী নেত্রীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত কে বিএনপির মনোনয়ন পাচ্ছেন, তা-ই এখন এই আসনের পরবর্তী সংসদ সদস্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
/এসএন